{{ news.section.title }}
মাত্র একটি টেনিস বলই যেভাবে হতে পারে আপনার পিঠের ব্যথার সমাধান!
কোমর থেকে একদম পায়ের নিচ পর্যন্ত নেমে যাওয়া সেই তীব্র বিদ্যুতের মতো ব্যথা, যাকে আমরা সায়াটিকা বলি। এর মূল কারণ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে নিতম্বের গভীরে থাকা ছোট্ট এক পেশিতে, নাম পিরিফর্মিস। এই পেশিটি যখন শক্ত হয়ে যায়, তখন এটি সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফিজিওথেরাপিস্টরা একে বলেন পিরিফর্মিস সিনড্রোম। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আপনার ড্রয়ারে পড়ে থাকা একটি সাধারণ টেনিস বল ব্যবহার করে আপনি নিজেই এই জমাট বাঁধা পেশি শিথিল করতে পারেন। কিন্তু এই সেলফ মাসাজ কি কেবল সাময়িক আরাম, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী কোনো কৌশলও!
Self Myofascial Release কী?
Self Myofascial Release হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে নিজের শরীরের নির্দিষ্ট পেশিতে নিয়ন্ত্রিত চাপ প্রয়োগ করে ফ্যাসিয়ার টান কমানোর চেষ্টা করা হয়। মানবদেহে প্রতিটি মাংসপেশিকে ঘিরে এক ধরনের সংযোজক কলা থাকে,নাম ফ্যাসিয়া। এটি মাংসপেশিকে আবৃত, সংযুক্ত ও সুরক্ষিত রাখে। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকা বা পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়ার কারণে ফ্যাসিয়া কখনও শক্ত বা আঠালো হয়ে যেতে পারে। তখন পেশির ভেতরে তৈরি হয় সংবেদনশীল বিন্দু। সেগুলোকে ট্রিগার পয়েন্ট বলা হয়। এই ট্রিগার পয়েন্টে চাপ দিলে ব্যথা কেবল ঐ স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনও তা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। SMR মূলত সেই সংবেদনশীল বিন্দুগুলোকেই লক্ষ্য করে কাজ করে।
পিরিফর্মিস ও সায়াটিক স্নায়ু:
পিঠের নিচের অংশের ব্যথার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাংসপেশি হলো Piriformis muscle। এটি নিতম্বের গভীরে অবস্থিত একটি ছোট এবং কার্যকর পেশি। এর ঠিক নিচ দিয়েই নেমে গেছে শরীরের অন্যতম বড় স্নায়ু Sciatic nerve। যখন পিরিফর্মিস পেশি অতিরিক্ত শক্ত বা প্রদাহগ্রস্ত হয়ে ওঠে, তখন এটি সায়াটিক স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কোমর থেকে নিতম্ব হয়ে উরু ও পায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে টান, জ্বালা বা ঝিনঝিনি অনুভূতি। একে সাধারণত সায়াটিক ধরনের ব্যথা বলা হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি,তা হলো সায়াটিক ব্যথার কারণ সবসময় পিরিফর্মিস নয়। অনেক ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের ডিস্কজনিত সমস্যা বা স্নায়ু চাপে থাকার কারণেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
টেনিস বল কীভাবে কাজ করে?
একটি টেনিস বল যখন নিতম্বের নির্দিষ্ট অংশে স্থাপন করে শরীরের ওজন ধীরে ধীরে তার ওপর ছাড়া হয়, তখন পেশির ভেতরের ট্রিগার পয়েন্টে যান্ত্রিক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এতে কয়েকটি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে-
১. পেশি শিথিলকরণ: অনেক সময় পেশি অজান্তেই গার্ডিং অবস্থায় থাকে অর্থাৎ প্রতিরক্ষামূলকভাবে শক্ত হয়ে থাকে। নিয়ন্ত্রিত চাপ পেশির স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যা অতিরিক্ত সংকোচন কমাতে সাহায্য করতে পারে। ধীরে ধীরে পেশি ঢিলে হতে শুরু করে।
২. রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন: চাপ প্রয়োগের সময় ঐ অঞ্চলে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। কিন্তু চাপ সরানোর পর রিবাউন্ড হাইপারেমিয়া নামে পরিচিত প্রতিক্রিয়ায় সেখানে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এতে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে এবং বিপাকীয় বর্জ্য দ্রুত সরতে সাহায্য করে। ফলে জড়তা ও অস্বস্তি কিছুটা কমে আসে।
৩. স্নায়ুর ওপর চাপ হ্রাস: যদি পিরিফর্মিস পেশি শিথিল হয়, তবে সায়াটিক স্নায়ুর ওপর যান্ত্রিক চাপও কমে যায়। এতে কোমর থেকে পায়ে ছড়িয়ে পড়া টান বা অস্বস্তি হ্রাস পায়। তবে এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।
৪. নিতম্বের গতিশীলতা বৃদ্ধি: নিয়মিত ও সঠিকভাবে করলে hip mobility উন্নত হতে পারে। হাঁটা, বসা, সিঁড়ি ওঠা-নামা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হয়ে থাকে।
কীভাবে করবেন?
১. সমতল মেঝেতে বসুন বা দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়ান।
২. যে পাশে টান বেশি, সেই পাশে নিতম্বের নিচে টেনিস বল রাখুন।
৩. ধীরে ধীরে শরীরের ওজন বলের ওপর ছাড়ুন।
৪. যে জায়গায় বেশি সংবেদনশীল মনে হবে, সেখানে ২০-৩০ সেকেন্ড স্থির চাপ দিন।
৫. এরপর ছোট বৃত্তাকারে নড়াচড়া করুন, যেন বলটি পেশির বিভিন্ন অংশে ঘোরে।
৬. পুরো প্রক্রিয়া ২-৩ মিনিট যথেষ্ট। দিনে ১-২ বার করা যেতে পারে। প্রথমে অস্বস্তি লাগতে পারে, তবে তীব্র অসহনীয় ব্যথা হওয়া উচিত নয়।
কখন সতর্ক হবেন?
☞ চাপ দেওয়ার সময় যদি তীব্র ব্যথা বেড়ে যায়।
☞ পায়ে অবশভাব বা ঝিনঝিনি বাড়তে থাকে।
☞ সাম্প্রতিক আঘাত, ডিস্ক স্লিপ বা হার্নিয়েটেড ডিস্ক থাকলে।
☞ ডায়াবেটিসজনিত নিউরোপ্যাথি থাকলে।
☞ গর্ভাবস্থায়।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা উচিত নয়।
এটি কি স্থায়ী সমাধান?
না। এটি উপসর্গ উপশমের একটি সহায়ক পদ্ধতি মাত্র। পিঠের ব্যথা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। কখনও এটি পেশি সংক্রান্ত, কখনও ডিস্ক, জয়েন্ট বা লিগামেন্ট সংক্রান্ত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ব্যথাকে কেবল একটি উপসর্গ নয়, একটি জটিল স্নায়ুবৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করে। তাই SMR উপকারী হলেও তা হওয়া উচিত সচেতন ও তথ্যভিত্তিক। নিয়মিত স্ট্রেচিং, কোর মাংসপেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম, সঠিক ভঙ্গিতে বসা, পর্যাপ্ত নড়াচড়া এসবের সমন্বয়েই দীর্ঘমেয়াদে উপকার পাওয়া সম্ভব।