আপনি কি আত্মবিশ্বাসী নাকি আত্মমুগ্ধ? নিজের আচরণ যাচাই করুন

আপনি কি আত্মবিশ্বাসী নাকি আত্মমুগ্ধ? নিজের আচরণ যাচাই করুন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আজকের এ যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে তুলে ধরা বা পারসোনাল ব্র্যান্ডিং অনিবার্য। কিন্তু লাইক আর কমেন্টের ইঁদুর দৌড়ে আমরা কি নিজেদের সত্যিকারের মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছি! যখন আমাদের আত্মতৃপ্তি কেবল অন্যের প্রশংসার ওপর নির্ভর করে, তখন আমরা অজান্তেই আত্মমুগ্ধতার ফাঁদে পা দিয়ে ফেলি। আত্মসম্মান হলো নিজের ভেতরের শান্তি, যা বাইরের স্বীকৃতির তোয়াক্কা করে না। কীভাবে এই লোকদেখানো শ্রেষ্ঠত্বের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আসল সত্তাকে মূল্যায়ন করবেন, জানুন সেই মানসিক পরিপক্বতারই পাঠ।

আত্মসম্মান হলো ভেতরের দৃঢ়তা।
আত্মসম্মান মানে নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই মেনে নেওয়া। এটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু অহংকারের সঙ্গে নয়। মনোবিজ্ঞানে আত্মসম্মানকে এমন একটি মানসিক অবস্থা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ব্যক্তি নিজের মূল্য সম্পর্কে স্থিতিশীল ও বাস্তবসম্মত ধারণা রাখেন। যার আত্মসম্মান আছে, সে নিজের ভুল স্বীকার করে নিতে পারে। নিজের সমালোচনা শুনতে পারে। অন্যের সাফল্যকে নিজের জন্য হুমকি হিসেবে অনুভব করে না। সম্পর্কের মধ্যে সম্মান ও পারস্পরিকতা বজায় রাখে। আত্মসম্মান আসলে আত্মপরিচয়ের স্থিতি।

আর অন্যদিকে আত্মমুগ্ধতা হলো বাহ্যিক উজ্জ্বলতা, ভেতরের ভঙ্গুরতা!
Narcissistic personality disorder–এর ধারণা থেকে আত্মমুগ্ধতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আত্মমুগ্ধ ব্যক্তি নিজেকে এক অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে থাকেন। তিনি সবার কাছেই প্রশংসা চান, সব জায়গায় বিশেষ সুবিধা আশা করেন, এবং নিজের যেকোনো সমালোচনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেন। বাইরে থেকে তাকে আত্মবিশ্বাসী মনে হতে পারেন। কিন্তু গভীরে থাকে অনিশ্চয়তা ও স্বীকৃতির এক অনিবারিত ক্ষুধা। আত্মমুগ্ধতার বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত  নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা, সহানুভূতির অভাব, অতিরিক্ত প্রশংসার প্রয়োজন, সম্পর্ককে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার পেছনে লুকিয়ে থাকে। এটি আত্মসম্মানের সম্প্রসারণ নয়, বরং অনিরাপত্তার আড়াল।

পার্থক্য কোথায়?
দুইয়ের পার্থক্য বোঝার জন্য কয়েকটি মানসিক সূচক দেখা যায়। যেমন-

১. সমালোচনায় প্রতিক্রিয়া : আত্মসম্মানী ব্যক্তি সমালোচনা শুনে ভাবেন, আর আত্মমুগ্ধ ব্যক্তি তা ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করেন।

২. সম্পর্কের ধরন: আত্মসম্মান পারস্পরিক সম্মান সৃষ্টি করে। কিন্তু আত্মমুগ্ধতা একমুখী নিয়ন্ত্রণ চায়।

৩. সাফল্যের ব্যাখ্যা: আত্মসম্মানী ব্যক্তি সাফল্যকে প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার ফল হিসেবে দেখেন। আত্মমুগ্ধ ব্যক্তি তা নিজের একক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ ভাবেন।

৪. ব্যর্থতার মোকাবিলা: আত্মসম্মান ব্যর্থতা থেকে শেখায় আর আত্মমুগ্ধতা ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপায়।

আত্মসম্মান গড়ে ওঠে নিরাপদ শৈশব, স্বীকৃতি ও বাস্তব প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। অন্যদিকে আত্মমুগ্ধতা অনেক সময় জন্ম নেয় অতিরিক্ত প্রশংসা বা বিপরীতভাবে, অবহেলা থেকে। শিশু যদি শিখেযে সে  বিশেষ, তাই নিয়মের ঊর্ধ্বে, অথবা সে মূল্যহীন, তাই নিজেকে বড় দেখাতে হবে! তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আত্মমুগ্ধ আচরণ দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ আত্মমুগ্ধতা প্রায়ই আত্মসম্মানের অভাবের বিকৃত রূপ।

সামাজিক মাধ্যমের যুগে বিভ্রান্তি:
বর্তমান সময়ে আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রচার একসঙ্গে চলছে। সামাজিক মাধ্যমে নিজের অর্জন তুলে ধরা টা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটি কি আত্মবিশ্বাস, নাকি স্বীকৃতির অবিরাম চাহিদা? যদি আত্মপরিচয় সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা আত্মসম্মান নয়, বরং আত্মমুগ্ধতার ঝুঁকি বাড়ায়।

সুস্থ আত্মসম্মান গড়ার মানসিক শিক্ষা:
১. স্ব-সচেতনতা: নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা লিখে দেখা।

২. বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ: অর্জনকে নিজের পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করা।

৩. সহানুভূতি চর্চা: অন্যের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা।

৪. সমালোচনা গ্রহণের অনুশীলন: প্রতিক্রিয়াকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে দেখা।

৫. অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি তৈরি করা: বাহ্যিক প্রশংসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করা।

নেতৃত্ব ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব:
একজন নেতা যদি আত্মসম্মানী হন, তিনি দলকে উৎসাহ দেন।
কিন্তু আত্মমুগ্ধ নেতা দলকে নিয়ন্ত্রণ করেন, কৃতিত্ব নিজের নামে নেন, এবং সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই চিত্র। আত্মসম্মান ভালোবাসা সৃষ্টি করে, আর আত্মমুগ্ধতা তৈরি করে দূরত্ব।

অনেকে মনে করেন আত্মসম্মান মানে নিজেকে বড় মনে করা। আসলে সত্যিকারের আত্মসম্মান নম্রতার সঙ্গে সহাবস্থান করে। কারণ নিজের মূল্য বুঝতে পারলে অন্যের মূল্য অস্বীকার করার প্রয়োজন পড়ে না। আত্মমুগ্ধতা যেখানে তুলনায় বাঁচে, আত্মসম্মান সেখানে স্থিরতায় বাঁচে।


সম্পর্কিত নিউজ