ভুল সিদ্ধান্ত থেকে মুক্তি: সঠিক জীবন গড়ার হাতিয়ার SWOT অ্যানালাইসিস!

ভুল সিদ্ধান্ত থেকে মুক্তি: সঠিক জীবন গড়ার হাতিয়ার SWOT অ্যানালাইসিস!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কয়েক মাস ধরে নিজেদের অডিট করে। কিন্তু আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট অর্থাৎ নিজেকে নিয়ে কতটা কৌশলগতভাবে ভাবি? SWOT Analysis কেবল কর্পোরেট মিটিং রুমের জন্য নয়। এটি আপনার ভেতরের অগোছালো চিন্তাগুলোকে একটি নিখুঁত মানচিত্রে রূপান্তর করার মন্ত্র। নিজের সবলতা আর দুর্বলতাগুলোকে যখন আপনি সাদা একটা কাগজে লিখে ফেলবেন, তখন জীবনের কুয়াশা কেটে গিয়ে আপনার সামনে ফুটে উঠবে সাফল্যের এক পরিষ্কার রাস্তা। আপনি কি প্রস্তুত নিজের একটি কৌশলগত অডিট করতে?

SWOT বিশ্লেষণের উৎস ও ধারণাগত ভিত্তি:
SWOT কাঠামোটি ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত কৌশলগত টুল, যা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মূল দর্শন হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং বহিরাগত পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। ব্যক্তিগত SWOT বিশ্লেষণ এই ধারণাকে আত্মউন্নয়নের পরিসরে নিয়ে আসে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি আত্ম-সচেতনতা এবং মেটাকগনিশন বা নিজের চিন্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তি নিজেদের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন, তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কম আবেগপ্রবণ এবং বেশি যুক্তিনির্ভর হন।

শক্তি শুধু প্রতিভা নয়। এটি দক্ষতা, জ্ঞান, মনোভাব ও আচরণের এক সমন্বিত রূপ।
শক্তির রয়েছে কিছু ধরন। যেমন:

১. জ্ঞানভিত্তিক শক্তি বা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা, গবেষণার ক্ষমতা।

২. দক্ষতাভিত্তিক শক্তি বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাগত পারদর্শিতা, উপস্থাপনা ক্ষমতা।

৩. ব্যক্তিত্বগত শক্তি বা ধৈর্য, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা।

৪. সম্পর্কভিত্তিক শক্তি বা নেটওয়ার্কিং, দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন মানুষ তার শক্তিগুলো কাজে লাগায়, তখন তার ফ্লো স্টেট তৈরি হয়। অর্থাৎ এমন মানসিক অবস্থা, যেখানে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্তি নয়, বরং আনন্দ অনুভূত হয়।

শক্তি চিহ্নিতের উপায়:
অতীতে কোন কাজগুলো আপনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন বা কোন কাজে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেন,  অন্যরা আপনার কোন গুণের প্রশংসা করে!

চাপের মুহূর্তে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়!ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন। শক্তি চিহ্নিত করার সময় আত্মতুষ্টি নয়, বরং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ বেশি প্রয়োজন।

আবার দুর্বলতা মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং এটি উন্নতির ক্ষেত্র। অনেকেই নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে অনীহা প্রকাশ করেন। একে মনোবিজ্ঞানে Self-serving bias বলা হয়। যেখানে মানুষ নিজের সাফল্যকে নিজের কৃতিত্ব এবং ব্যর্থতাকে বাহ্যিক কারণে দায়ী করে।

দুর্বলতারও রয়েছে কিছু ধরন। যেমন:

১। সময় ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা

২। আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

৩। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা

৪। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি

৫। নির্দিষ্ট দক্ষতায় ঘাটতি

দুর্বলতা চিহ্নিতের উপায়:
কোন কারণে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বা কোন সমালোচনা বারবার শুনতে হয়! কোন পরিস্থিতিতে আপনি অস্থির হয়ে পড়েন! ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। দুর্বলতাকে স্বীকার করা আত্মসম্মান কমানো নয়, বরং এটি আত্মোন্নয়নের সূচনা।

সুযোগ আসে বাহ্যিক পরিবেশ থেকে। প্রযুক্তি, শিক্ষা, বাজার, সামাজিক পরিবর্তন সবই আমাদের  সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। আজকের বিশ্বে ডিজিটাল দক্ষতা, বহুভাষিক যোগাযোগ, ডাটা বিশ্লেষণ, সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দ্রুত চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল কাজের সুযোগ, বৈশ্বিক সহযোগিতা এসবই নতুন সম্ভাবনার অংশ।

আর  ঝুঁকি হলো সম্ভাব্য বাধা বা অনিশ্চয়তা।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র প্রতিযোগিতা, স্বাস্থ্য সমস্যা এসবই ব্যক্তিগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি কেউ একমাত্র একটি দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হন এবং সেই ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, তাহলে সেটি বড় হুমকি।

SWOT ম্যাট্রিক্স, চার উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক
SWOT বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই চারটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। শক্তি ব্যবহার করে সুযোগকে কাজে লাগানো। দুর্বলতা কমিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলা। সুযোগকে শক্তিতে রূপান্তর। আর ঝুঁকি মোকাবিলায় বিকল্প দক্ষতা তৈরি করা। এই কৌশলগত চিন্তাই SWOT-কে কার্যকর করে তোলে।

ব্যক্তিগত SWOT বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি:
১. একটি নিরিবিলি সময় নির্ধারণ করুন।

২. চারটি অংশে কাগজ ভাগ করুন।

৩. প্রতিটি অংশে অন্তত ৮-১০টি পয়েন্ট লিখুন।

৪. বিশ্বস্ত সহকর্মী বা বন্ধুর মতামত নিন।

৫. বাস্তব উদাহরণ দিয়ে প্রতিটি পয়েন্ট যাচাই করুন।
৬. একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করুন যে, কোন শক্তি বাড়াবেন, কোন দুর্বলতা কমাবেন, কোন সুযোগ ধরবেন।
৭. প্রতি ৬-১২ মাস অন্তর বিশ্লেষণ হালনাগাদ করুন।

আত্মবিশ্লেষণ থেকে আত্মনির্মাণ:
SWOT বিশ্লেষণ শুধু একটি তালিকা করা না। এটি আত্মপরিবর্তনের নকশা। যদি আপনার শক্তি হয় বিশ্লেষণী চিন্তা, তবে গবেষণা বা ডাটাভিত্তিক কাজে মনোযোগ দিন।
যদি দুর্বলতা হয় জনসমক্ষে কথা বলার ভয়, তবে প্রশিক্ষণ নিন।যদি সুযোগ হয় নতুন প্রযুক্তি শেখা, তবে বিলম্ব না করে শুরু করুন। যদি ঝুঁকি হয় দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, তবে বিকল্প দক্ষতা অর্জন করুন। আত্মবিশ্লেষণ যখন কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয়, তখনই সত্যিকারের পরিবর্তন শুরু হয়।

আমাদের জীবনটা প্রতিযোগিতামূলক, অনিশ্চিত এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মসচেতনতা, কৌশলগত চিন্তা ও অভিযোজন ক্ষমতা। পার্সোনাল SWOT বিশ্লেষণ সেই পথ দেখায়।  নিজেকে চেনা মানেই নিজের ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ। কারণ, যে মানুষ নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন, তার সিদ্ধান্ত হয় পরিণত, পরিকল্পিত এবং টেকসই। আজই হয়তো সময়, একটু থেমে নিজের দিকে তাকানোর। কারণ আত্মজ্ঞানই হলো দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।


সম্পর্কিত নিউজ