{{ news.section.title }}
হাঙরের সামনে মানুষ, ঢাল হয়ে দাঁড়ায় ডলফিন! রহস্য কী?
প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম হলো সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট বা শক্তিশালীরাই টিকে থাকবে। কিন্তু ডলফিন এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিখিয়েছে সহমর্মিতার শক্তি। ডলফিনরা দলগতভাবে যেভাবে একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনে মানুষকেও সেই গণ্ডিতে টেনে নেয়, তা বিবর্তনবাদের অনেক তাত্ত্বিক ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় । ডলফিনের এই নিঃস্বার্থ আচরণের পেছনে কি কোনো সামাজিক চুক্তি আছে, নাকি এটি প্রকৃতির এক পরম ভালোবাসা!
ডলফিনের মস্তিষ্ক অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। তাদের মস্তিষ্কের গঠনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্যারালিম্বিক সিস্টেম, যা আবেগ এবং সামাজিক আচরণের জন্য দায়ী। এছাড়া ডলফিন ব্যবহারের জন্য প্রাকৃতিক সোনোর বা ইকোলোকেশন (Echolocation) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা পানির নিচে কয়েকশ ফুট দূর থেকে কোনো কম্পন বা হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারে। যখন কোনো মানুষ পানিতে ডুবে যায় বা বিপদে পড়ে, তখন তার হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিক গতি এবং শ্বাসকষ্টের কম্পন ডলফিনের সেন্সরে ধরা পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে জীবটি বিপন্ন, আর তখনই তাদের সহজাত কৌতূহল ও সহায়তার প্রবৃত্তি জেগে ওঠে।
ডলফিন অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী এবং তারা সাধারণত পড (Pod) বা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে থাকে। তাদের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো নিজের দলের কোনো সদস্য বা শিশু আহত হলে তাকে পানির ওপরের স্তরে তুলে ধরা যাতে সে শ্বাস নিতে পারে। ডলফিনের চোখে মানুষ হয়তো তাদের দলের কেউ নয়, কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে মানুষের অসহায়ত্ব তাদের মধ্যে সেই একই নার্সিং ইন্সটিংক্ট বা সেবামূলক আচরণ জাগ্রত করে। তারা অবচেতনভাবেই মানুষকে তাদের দলের কোনো দুর্বল সদস্যের মতো রক্ষা করার চেষ্টা করে থাকে।
অনেক সময় দেখা যায়, ডলফিন মানুষকে হাঙরের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে চারপাশ দিয়ে একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করে দেয়। এটি ডলফিনের একটি সুপরিকল্পিত প্রতিরক্ষা কৌশল। সমুদ্রে ডলফিন এবং হাঙর একে অপরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ডলফিন জানে যে একা একটি হাঙরকে হারানো কঠিন, তাই তারা দলবদ্ধভাবে আক্রমণকারীকে ভয় দেখায়। যখন তারা কোনো মানুষের চারপাশে হাঙরকে ঘুরতে দেখে, তখন তাদের সেই দীর্ঘদিনের শত্রুতামূলক প্রবৃত্তি কাজ করে এবং তারা শিকারিকে তাড়ানোর জন্য মানুষের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডলফিনের মস্তিষ্কে স্পিন্ডল নিউরনের উপস্তিতি রয়েছে, যা সাধারণত মানুষ এবং বড় বানরদের মধ্যে দেখা যায়। এই নিউরনগুলো ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক বন্ধনের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে। এই উচ্চতর আবেগীয় সক্ষমতার কারণেই ডলফিন অন্য প্রাণীর কষ্ট অনুভব করতে সক্ষম। তারা কেবল বুদ্ধির জোরে নয়, বরং এক ধরনের আত্মিক টানেই মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ডলফিন এবং মানুষের এই অদৃশ্য বন্ধন প্রমাণ করে যে প্রকৃতির ভেতর দয়া ও পরোপকার কেবল মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়।
ডলফিনের এই সাহায্য করার প্রবণতা কাকতালীয় কিছু নয়। এটি তাদের উচ্চতর মেধা, বিবর্তনীয় প্রবৃত্তি এবং গভীর আবেগের এক জটিল সমন্বয়। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে একজন মানুষের জন্য ডলফিন যখন রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা প্রাণিজগতের মধ্যকার এক অনন্য সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। আদিম কাল থেকে চলে আসা এই বন্ধুত্ব আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাসাগরের নীল পানির নিচেও বয়ে চলেছে সহমর্মিতার এক অবিনশ্বর ধারা।