জানেন কি কাক কেন চকচকে জিনিস দিয়ে ঘর সাজায়!

জানেন কি কাক কেন চকচকে জিনিস দিয়ে ঘর সাজায়!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

মানুষের মতো কাকদের জগতেও কি স্ট্যাটাস বা আভিজাত্য নিয়ে লড়াই আছে! কিছু গবেষক মনে করেন, কাকের বাসায় চকচকে জিনিসের উপস্থিতি তাদের সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করতে কিংবা শত্রুকে ভয় দেখাতে সাহায্য করে। একে বলা হয় অ্যানিম্যাল আর্কিটেকচার। যে কাকের বাসায় যত বেশি বিরল আর উজ্জ্বল বস্তু থাকে, সেই কাকের আধিপত্য নাকি তত বেশি! কিন্তু এই সংগ্রহের নেশা কি কেবলই সামাজিক, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো বিবর্তনীয় টিকে থাকার লড়াই?

কাককে সাধারণত পাখিদের জগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের একজন ধরা হয়। প্রাকৃতিকভাবেই কাক অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে থাকে। তাদের মস্তিষ্কের আয়তন ও শরীরের ওজনের অনুপাত অনেকটা শিম্পাঞ্জি বা মানুষের কাছাকাছি। এই উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার কারণেই তাদের মধ্যে অদম্য কৌতূহল কাজ করে। কোনো জিনিস চকচক করলে কাক সেটি পরীক্ষা করে দেখতে চায় এটি কি খাদ্য নাকি অন্যকিছু। চকচকে বস্তুগুলো, সাধারণত প্রকৃতির সাধারণ উপাদান যেমন, ডালপালা বা পাতার চেয়ে আলাদা হয়। যা কিছু নতুন বা আলাদা, তা নিয়েই কাকেরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পছন্দ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি তাদের ইনভেস্টিগেটিভ বিহেভিয়ার বা অনুসন্ধিৎসু আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।

শিকারি প্রবৃত্তি এবং খাদ্যের সংকেত:
প্রকৃতিতে অনেক সময় পানির প্রতিফলন বা মাছের আঁশের চিকচিক ভাব দেখে কাক খাদ্যের উৎস শনাক্ত করে। বিবর্তনীয়ভাবে কাকের চোখে চকচকে ভাবটি অনেক সময় সম্ভাব্য খাদ্যের সংকেত হিসেবে কাজ করে। যদিও একটি চাবির রিং খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উজ্জ্বল কোনো কিছু দেখলেই তাদের মস্তিষ্ক সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে ধরে নেয়। এই সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই তারা অপ্রয়োজনীয় কিন্তু উজ্জ্বল বস্তুর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।

আকর্ষণ এবং সামাজিক প্রভাব:
কিছু গবেষকের মতে, পুরুষ কাকেরা তাদের বাসা সাজানোর জন্য বা স্ত্রী কাককে আকৃষ্ট করার জন্য উজ্জ্বল বস্তু ব্যবহার করে থাকে। এটি অনেকটা শক্তির বা দক্ষতার প্রদর্শনী। তবে এই তত্ত্বটি বোয়ারবার্ড (Bowerbird)-এর ক্ষেত্রে যতটা প্রমাণিত, কাকের ক্ষেত্রে তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তবুও দেখা গেছে, যে বাসায় উজ্জ্বল বস্তুর আধিক্য থাকে, সেখানে কাকেরা নিজেদের এলাকা বা রাজত্ব জাহির করার একটি মানসিক তৃপ্তি খুজে পায়।

নিওফিলিয়া বনাম নিওফোবিয়া!
প্রাণিবিজ্ঞানে নিওফিলিয়া বলতে নতুন বস্তুর প্রতি আকর্ষণকে বোঝায়। কাকেরা একইসাথে নতুন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট  আবার সতর্কও। তারা প্রথমে কোনো উজ্জ্বল বস্তু দেখলে সাবধানে সেটিকে পর্যবেক্ষণ করে। যখন বুঝতে পারে যে বস্তুটি ক্ষতিকর নয়, তখন তারা সেটিকে একটি খেলনা বা সম্পদ হিসেবে তাদের সংগ্রহে রেখে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, কাকেরা কেবল একঘেয়েমি দূর করার জন্য বা নিছক খেলা করার ছলেও বিভিন্ন ধরনের  চকচকে জিনিসগুলো কুড়িয়ে আনে।

বিশেষ কিছু তথ্য :
ভ্রান্ত ধারণা: অনেকে মনে করে থাকেন কাক কেবল চুরি করার জন্য এসব নেয়। আসলে তারা কোনো আর্থিক মূল্য বোঝে না। তাদের কাছে এটি কেবল একটি বিশেষ চেহারার বস্তু।

বিস্ময়কর তথ্য: কাক কেবল বস্তু চেনে না, তারা মানুষের মুখও মনে রাখতে পারে। আপনি যদি একবার কোনো কাকের চকচকে খেলনা কেড়ে নেন, সে আপনাকে অনেকদিন মনে রাখবে এবং সুযোগ পেলে চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করবে।

উপকারী দিক: এই স্বভাবের কারণে অনেক সময় কাকেরা পরিবেশের কিছু প্লাস্টিক বা ধাতব বর্জ্য এক জায়গায় জড়ো করে, যা পরোক্ষভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে।

কাকের চকচকে জিনিস জমানোর অভ্যাসটি আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এটি তাদের বিবর্তনীয় শ্রেষ্ঠত্বের একটি প্রমাণ। তাদের কৌতূহলী মন এবং চারপাশকে চেনার আকুলতাই তাদের এই সংগ্রাহক সত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রকৃতির এই চতুর কালো রঙের পাখিটি আসলে আমাদের শেখায় যে, বুদ্ধিমান প্রাণী মাত্রই অজানাকে জানার এবং নতুনকে পরখ করার নেশায় মত্ত থাকে।


সম্পর্কিত নিউজ