আপনার মাথায় কারেন্ট আছে ? জানুন মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা জাদুকরী শক্তি!

আপনার মাথায় কারেন্ট আছে ? জানুন মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা জাদুকরী শক্তি!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আপনি এখন যা পড়ছেন, তা আপনার মস্তিষ্কের ভিতর বিদ্যুৎ হিসেবে পরিবাহিত হচ্ছে। আমাদের প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি আবেগ আসলে কিছু বৈদ্যুতিক সংকেতেরই সমাহার। গবেষকরা দেখিয়েছেন, যদি আমরা মস্তিষ্কের এই শক্তিকে কোনোভাবে একীভূত করতে পারতাম, তবে তা দিয়ে একটি ছোট ডিভাইস চার্জ দেওয়া অসম্ভব হতোনা।

আপনার মস্তিষ্ক কি একটি আস্ত বাল্ব জ্বালাতে সক্ষম?
আমাদের মস্তিষ্ক কয়েক বিলিয়ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষের একটি জালিকা, যাকে বলা হয় নিউরন। আমরা যখন কোনো কিছু চিন্তা করি, দেখি বা অনুভব করি, তখন এই নিউরনগুলো একে অপরের কাছে তথ্য পাঠায়। এই তথ্য আদান প্রদান কোনো জাদুর মাধ্যমে নয়, ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্পন্দনের মাধ্যমে ঘটে। যদিও প্রতিটি নিউরনের উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ অতি সামান্য, কিন্তু যখন শত কোটি নিউরন একসাথে কাজ করে, তখন মোট বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ থেকে ২৩ ওয়াট! আর এই পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি স্বল্প ক্ষমতার এলইডি বাল্ব জ্বালানোর জন্য যথেষ্ট।

জৈব বিদ্যুৎ বা বায়ো ইলেকট্রিসিটির উৎস কি?
মস্তিষ্কের এই বিদ্যুৎ কোনো তারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় না। এটি তৈরি হয় কোষের পর্দার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ লবণের আয়নের মাধ্যমে। একে বলা হয় অ্যাকশন পটেনশিয়াল। নিউরনগুলো যখন উত্তেজিত হয়, তখন এই আয়নগুলি কোষের ভেতরে বাইরে যাতায়াত করে এবং একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে।এটি ব্যাটারির মতো কাজ করে, যা ক্রমাগত চার্জ ও ডিসচার্জ হচ্ছে।

ঘুমের সময়ও কি এই বিদ্যুৎ তৈরি হয়?
বিস্ময়কর তথ্য হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয় না। আমরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকি, তখনও মস্তিষ্ক নিজেকে পরিষ্কার করা এবং স্মৃতি গুছিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের নির্দিষ্ট কিছু পর্যায়ে, যেমন-REM স্লিপ, মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ জাগ্রত অবস্থার চেয়েও অনেক সময় বেশি থাকে। অর্থাৎ, আপনার মাথার ভেতরের এই মিনি পাওয়ার প্ল্যান্টটি দিন রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে।

মেধার সাথে কি বিদ্যুতের কোনো সম্পর্ক আছে?
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, বেশি বুদ্ধিমান মানুষের মাথায় কি তবে বেশি ওয়াটের বিদ্যুৎ তৈরি হয়! বিজ্ঞানের উত্তর হলো, না। বুদ্ধিমত্তা বিদ্যুতের পরিমাণের ওপর নয়, নিউরনগুলো কত দ্রুত এবং কতটা দক্ষতার সাথে একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করে। একে বলা হয় সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি। দক্ষ মস্তিষ্ক আসলে কম শক্তি ব্যয় করে বেশি কাজ সম্পাদন করতে পারে।

কেন আমরা শক খাই না?
আমাদের মস্তিষ্কের এই বিদ্যুৎ প্রবাহ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিয়ন্ত্রিত। নিউরনগুলোর চারপাশে মায়োলিন শিথ নামক একটি চর্বিযুক্ত আবরণ থাকে, যা বিদ্যুতের তারের ওপর থাকা প্লাস্টিক ইনসুলেশনের মতো কাজ করে। এটি নিশ্চিত করে যে বৈদ্যুতিক সংকেতগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে না পড়ে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছায়। এই মায়োলিন পর্দা নষ্ট হয়ে গেলেই মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো স্নায়বিক রোগের সৃষ্টি হয়।

কিছু তথ্য:
☞ মস্তিষ্কের জ্বালানি: এই বিদ্যুৎ তৈরির জন্য মস্তিষ্কের প্রচুর অক্সিজেন এবং গ্লুকোজ প্রয়োজন। শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০% একাই খরচ করে মস্তিষ্ক। তাই নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া জরুরি।

☞ পানির ভূমিকা: যেহেতু আয়ন প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তাই শরীর পানিশূন্য থাকলে এই বৈদ্যুতিক সিগন্যালগুলো ধীর হয়ে যায়। এর ফলে মাথাব্যথা বা মনোযোগের অভাব দেখা দেয়।

☞ বিস্ময়কর সম্ভাবনা: বর্তমানে বিজ্ঞানীরা Brain-Computer Interface (BCI) প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা মস্তিষ্কের এই ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ তরঙ্গকে শনাক্ত করে কৃত্রিম হাত পা চালানো বা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

মানুষের মস্তিষ্ক প্রকৃতির এক অনন্য প্রকৌশল। একটি ছোট বাল্ব জ্বালানোর মতো ক্ষমতা রাখা এই অঙ্গটি আসলে আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। আমরা যা ভাবি, যা করি সবই এই ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্পন্দনের খেলা। এই পাওয়ার হাউসটিকে সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক প্রশান্তি অপরিহার্য।
 


সম্পর্কিত নিউজ