কেন রোজা রাখবেন? বিজ্ঞানের চোখে শরীরের ভেতরকার মেরামত!

কেন রোজা রাখবেন? বিজ্ঞানের চোখে শরীরের ভেতরকার মেরামত!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

প্রচলিত ধারণা হলো, না খেয়ে থাকলে মস্তিষ্ক ঠিক মতো কাজ করে না। কিন্তু নিউরো সায়েন্টিস্টরা বলছেন, সম্পূর্ণ উল্টো কথা। দীর্ঘ উপবাসের সময় আমাদের লিভার থেকে উৎপন্ন কিটোন বডি, মস্তিষ্কের জন্য প্রিমিয়াম ফুয়েল হিসেবে কাজ করে। এই অবস্থায় মস্তিষ্কে BDNF নামক এক বিশেষ প্রোটিন তৈরি হয়, যা নতুন নিউরন জন্মাতে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, পেট খালি থাকলে মস্তিষ্ক আসলে এক ধরনের সারভাইভাল মোডে চলে যায়, যা আমাদের মনোযোগ আর সৃজনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অটোফ্যাজি, শরীরের নিজস্ব রিসাইকেল বিন!
রোজার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অবদান হলো অটোফ্যাজি। ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি এই প্রক্রিয়ার রহস্য উন্মোচন করে নোবেল পুরস্কার পান। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরের সুস্থ কোষগুলো ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে এবং তখন তারা শরীরের ভেতরে থাকা মৃত, ক্ষতিগ্রস্ত বা বিষাক্ত প্রোটিনগুলোকে খেয়ে ফেলে শক্তি উৎপাদন করে। সহজ কথায়, রোজা রাখলে আমাদের শরীর ভেতর থেকে নিজেকে পরিষ্কার করে এবং ক্যান্সার বা আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। এটি যেন শরীরের একটি সেলফ-ক্লিনিং মোড।

বিপাকীয় পরিবর্তন এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা
রোজা রাখার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায় এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। যখন শরীর দীর্ঘক্ষণ শর্করা পায় না, তখন এটি জমানো চর্বি পুড়িয়ে শক্তি তৈরি করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কিটোসিস। এর ফলে শুধু ওজনই কমে না, বরং লিভারে জমে থাকা চর্বি দূর হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতেও রোজার ভূমিকা অপরিসীম।

মানসিক প্রভাব: 
রোজার প্রভাব কেবল শরীরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের সময় মস্তিষ্কে BDNF (Brain-Derived Neurotrophic Factor) নামক একটি প্রোটিনের উৎপাদন বেড়ে যায়। এই প্রোটিনটি নতুন নিউরন তৈরিতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যা অনেকটা মস্তিষ্কের জন্য সার হিসেবে কাজ করে। এর ফলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।

ইচ্ছাশক্তি এবং ডোপামিন ডিটক্স!
মানসিকভাবে রোজা একজন মানুষকে অত্যন্ত ধৈর্যশীল করে তোলে। আধুনিক যুগে আমরা সারাক্ষণ মোবাইল ফোন, জাঙ্ক ফুড বা নানা ধরনের আসক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণ করি, যা আমাদের অস্থির করে তোলে। রোজা রাখার মাধ্যমে যখন আমরা নিজের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক একটি ডিটক্স প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। এক মাসব্যাপী এই শৃঙ্খলা মানুষের মনের ভেতর এক ধরণের গভীর প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক তৃপ্তি এনে দেয়।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মূলত রোজার শাশ্বত উপকারেরই একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং মনকে কলুষমুক্ত করতে রোজার চেয়ে কার্যকর কোনো প্রাকৃতিক পদ্ধতি আর হতে পারে না।


সম্পর্কিত নিউজ