{{ news.section.title }}
আপনি কি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন? সমাধান লুকিয়ে আছে পর্যাপ্ত ঘুমে!
আমরা অনেক সময়ই ভাবি, কম ঘুমালে কেবল পরের দিন একটু শরীরটা খারাপ লাগবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আমাদের সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি কমে যায়। তখন জীবনসঙ্গীর সামান্য ভুল বা সহকর্মীর সমালোচনা আমাদের কাছে পাহাড়সম অপরাধ মনে হয়। দিনের পর দিন এই খিটখিটে মেজাজ আর অকারণ ক্ষোভ আপনার সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
মানব মস্তিষ্কে আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান দুটি অংশ হলো অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। অ্যামিগডালা বিপদ, ভয় ও তীব্র আবেগ শনাক্ত করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অন্যদিকে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সংযমের মাধ্যমে সেই প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই দুই অংশের সমন্বয় দুর্বল হয়ে যায়। ফলে অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী অংশটি ধীরগতির হয়ে পড়ে। এর অর্থ হলো, আপনি অতি দ্রুতই রেগে যাবেন, অনেক বেশি হতাশ হবেন, কিন্তু নিজেকে থামানোর শক্তি আস্তে আস্তে কমে যাবে। ঘুমের ঘাটতির ফলে অ্যামিগডালার প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে, এমন ইঙ্গিত বিভিন্ন স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ একই ঘটনা, যা স্বাভাবিক দিনে সামান্য বিরক্তি তৈরি করত, ঘুমহীন অবস্থায় তা বড় সংকটের মতো মনে হতে পারে।
হরমোনের ভারসাম্যও বদলে যায়!
ঘুম আমাদের হরমোন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কর্টিসল, যা স্ট্রেস হরমোন হিসেবে পরিচিত, ঘুম কম হলে বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা মেজাজ ও আনন্দ অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ফলে ক্ষুদ্র বিষয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, আবেগের ওঠানামা, অকারণ বিষণ্ণতা, সিদ্ধান্তহীনতা, সামাজিক দূরত্ব তৈরি হওয়া ইত্যাদি পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।
ঘুম ও আবেগের সম্পর্ক!
ঘুমের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো, নন রেম ও রেম (REM)। বিশেষ করে রেম ঘুম আবেগ প্রক্রিয়াকরণে বড় ভূমিকা রাখে। দিনের বিভিন্ন মানসিক অভিজ্ঞতা রেম ঘুমের সময় পুনর্গঠিত হয়। যদি এই ধাপ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে মস্তিষ্ক দিনের মানসিক চাপ সঠিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে না। ফলে পরদিন আবেগের চাপ জমে থাকে। ঘুমের সময় যত কমে, আবেগের প্রতিক্রিয়াশীলতা ততই বৃদ্ধি পায়।
কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাব:
ঘুমের ঘাটতি কেবল ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাব হতে পারে। যেমন :
⇨ তাৎক্ষণিক রাগ
⇨ ভুল সিদ্ধান্ত
⇨ ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ
⇨ দলগত কাজের ব্যাঘাত
⇨ সৃজনশীলতার ঘাটতি ইত্যাদি।
বিশেষ করে যেসব পেশায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেমন- স্বাস্থ্যসেবা, গণমাধ্যম, পরিবহন, প্রশাসন, সেখানে ঘুমহীনতা বিপজ্জনক হতে পারে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে পক্ষপাতমূলক বা তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ে।
পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কে সূক্ষ্ম ক্ষয়!
একজন ঘুমবঞ্চিত মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারেন না যে তার প্রতিক্রিয়া কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে। পরিবারের সদস্যরা হয়তো ভাবেন, তিনি বদলে গেছেন। কিন্তু বাস্তবে বদলাচ্ছে তার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি দাম্পত্য সম্পর্কে উত্তেজনা, সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিও বাড়ায়। আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি মানে শুধু রাগ নয়। এর মধ্যে রয়েছে সহানুভূতি কমে যাওয়া, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা হ্রাস, ক্ষমা করতে না পারা, ছোট বিষয়কে বড় করে দেখা ইত্যাদি।
মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি:
দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে উদ্বেগজনিত সমস্যা ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কারণ ঘুম মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। যদি নিয়মিত ৬ ঘণ্টার কম ঘুম হয়, এবং সেই অবস্থায়ই মাসের পর মাস চলতে থাকে, তাহলে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ক্রনিক আকার নিতে পারে।
ডিজিটাল জীবন ও ঘুমের সংকট:
রাত জেগে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, সিরিজ দেখা, কিংবা কাজের চাপ এসব আমাদের আধুনিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যা ঘুমের সূচনা বিলম্বিত করে। ফলে ঘুমের সময় কমে যায়, আবার ঘুমের গভীরতাও কমে। এই দ্বৈত আঘাত আবেগীয় স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে তোলে।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে:
শিশুদের মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান। তাদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। অতিরিক্ত খিটখিটে আচরণ, মনোযোগের ঘাটতি, স্কুলে আচরণগত সমস্যা ইত্যাদির পেছনে অনেক সময় ঘুমের অভাব কাজ করে।
কীভাবে রক্ষা পাবেন?
১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস করুন।
২. ঘুমের আগে অন্তত এক ঘণ্টা স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন।
৩. শোবার ঘর অন্ধকার ও নীরব রাখুন।
৪. বিকেলের পর ক্যাফেইন কমান।
৫. মানসিক চাপ কমাতে হালকা শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলন করতে পারেন।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
একটি রাতের ঘুমহীনতা হয়তো বড় ক্ষতি করে না, কিন্তু অভ্যাসগত ঘুমের ঘাটতি আমাদের মনের ভিতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষটিকে অকার্যকর করে দিতে পারে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে সাম্প্রতিক সময়ে অকারণ রাগ, অস্থিরতা বা হতাশা বেড়েছে! তাহলে প্রথম প্রশ্নটি হতে পারে, শেষ কবে পূর্ণ রাতের ঘুম হয়েছে?