{{ news.section.title }}
খাবারে বসেই মাছি কেন হাত ঘষে নেয় জানেন কি?
খাবারের ওপর মাছি বসলেই আমরা দেখি যে, তারা খুব আয়েশ করে নিজেদের সামনের দুই পা ঘষছে। দেখে মনে হতে পারে মাছি হয়তো কোনো ভোজের প্রস্তুতি নিচ্ছে! কিন্তু আসল কারণটি বেশ চমকপ্রদ। মাছির জন্য তাদের পা হলো শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেন্সর বা সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। তারা পা দিয়ে শুধু হাঁটেই না, স্বাদ গ্রহণ এবং চারপাশের পরিবেশ বুঝতে সক্ষম হয়। পা ঘষার মাধ্যমে তারা মূলত তাদের এই জৈবিক রাডারই পরিষ্কার করে।
মাছির অদ্ভুত হাত ঘষার রহস্য!
মাছি বা হাউসফ্লাই আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও, এদের শারীরিক গঠন এবং জীবনধারণের পদ্ধতি অনেক বিস্ময়কর। মাছি যখন তার সামনের পা দুটো একে অপরের সাথে ঘষতে থাকে, তখন সে আসলে তার শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে সচল ও কার্যকর রাখার চেষ্টা চালায়। এই প্রক্রিয়াটি কেবল পরিষ্কার হওয়ার জন্য নয়, বরং মাছির স্বাদ গ্রহণ, ঘ্রাণ নেওয়া এবং ওড়ার সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
স্বাদ গ্রহণ:
মানুষের জিভ যেমন খাবারের স্বাদ বুঝতে পারে, মাছির ক্ষেত্রে সেই কাজটির বড় অংশ সম্পন্ন হয় তার পায়ের মাধ্যমে। মাছির পায়ে কেমোরেসেপ্টর নামক বিশেষ এক ধরণের সংবেদনশীল কোষ থাকে। যখন একটি মাছি কোনো বস্তুর ওপর বসে, তখন সে তার পায়ের সাহায্যেই বুঝতে পারে সেটি খাবারযোগ্য কি না। কিন্তু উড়াউড়ি করার সময় বা বিভিন্ন নোংরা স্থানে বসার ফলে মাছির পায়ে ধুলিকণা, চিনি বা চর্বির আস্তরণ জমে যায়। এই ময়লা যদি পায়ের সংবেদনশীল কোষগুলোকে ঢেকে ফেলে, তবে মাছি খাবারের স্বাদ বা রাসায়নিক সংকেত বুঝতে পারে না। তাই নিজের স্বাদ ইন্দ্রিয় সচল রাখতে সে বারবার পা ঘষে ময়লা পরিষ্কার করে নেয়।
উড্ডয়ন:
মাছির পায়ের তলায় পালভিলি নামক এক ধরণের ক্ষুদ্র আঠালো প্যাড থাকে। এই প্যাডগুলো থেকেই মাছি একটি বিশেষ তৈলাক্ত তরল নিঃসরণ করে, যা তাকে মসৃণ কাঁচ বা সিলিংয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে সাহায্য করে। উড়ার সময় এই আঠালো অংশে ধুলোবালি আটকে গেলে মাছির গ্রিপ বা ধরা রাখার যে ক্ষমতা,তা কমে যায়। পা ঘষার মাধ্যমে মাছি এই আঠালো অংশটি পরিষ্কার রাখে যাতে সে যে কোনো তলে শক্তভাবে বসতে পারে এবং প্রয়োজন হওয়া মাত্রই দ্রুত উড়াল দিতে পারে। অর্থাৎ, এই হাত ঘষা মাছির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রি-ফ্লাইট চেক বা উড্ডয়ন প্রস্তুতি।
চোখের সুরক্ষা এবং সেন্সর পরিষ্কার করা!
মাছি কেবল তার পা নয়, বরং পায়ের সাহায্যে তার মাথা এবং চোখও পরিষ্কার করে নেয়। মাছির চোখ হলো কম্পাউন্ড আই বা পুঞ্জাক্ষি, যা হাজার হাজার ছোট ছোট লেন্স দিয়ে গঠিত। এই লেন্সগুলোতে ধুলো জমলে মাছি ঠিকমতো দেখতে পায় না এবং তার শত্রুর উপস্থিতিও বুঝতে দেরি হতে পারে। পা ঘষে পরিষ্কার করার পর সেই পরিষ্কার পা দিয়ে সে তার চোখ এবং মাথার ওপরের অ্যান্টেনাগুলো মুছে নেয়। এটি মাছির জন্য একটি সামগ্রিক গ্রুমিং প্রক্রিয়া, যা তাকে চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সজাগ থাকতে সাহায্য করে।
রোগজীবাণু ছড়ানোর কারণ:
মাছির এই পরিষ্কার হওয়ার প্রবণতাই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাছি যখন কোনো পচা আবর্জনা বা মলমূত্রের ওপর বসে, তখন তার পায়ে লাখ লাখ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস আটকে যায়। এরপর যখন সে আমাদের খাবারের ওপর বসে হাত ঘষতে শুরু করে, তখন তার গা থেকে সেই জীবাণুগুলো ঝরে খাবারের সাথে মিশে যায়। মাছি নিজেকে পরিষ্কার করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবেই টাইফয়েড, কলেরা বা ডায়রিয়ার মতো রোগের জীবাণু মনুষ্য পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়।
সতর্কতা:
☞ মাছি তার জাগ্রত অবস্থার একটি বড় অংশ ব্যয় করে এই গ্রুমিং বা পরিষ্কার হওয়ার কাজে। এটি তাদের ডিএনএ তে থাকা একটি সহজাত প্রবৃত্তি।
☞ মাছির পায়ে থাকা রোমগুলো বাতাসের আর্দ্রতা এবং রাসায়নিক পরিবর্তন বুঝতে পারে। পা পরিষ্কার না থাকলে মাছি তার প্রজনন সঙ্গী খুঁজে পেতেও ব্যর্থ হয়।
☞ খাবারের সতর্কতা: মাছি কোনো খাবারে বসা মাত্রই হাত ঘষতে শুরু করলে বুঝতে হবে সে তার এনজাইম বা পা থেকে জীবাণু সেখানে স্থানান্তরিত করছে। তাই খোলা খাবার বর্জন করা এবং মাছি বসা খাবার না খাওয়াই সবার জন্য শ্রেয়।
প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণীর আচরণের পেছনেই কোনো না কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক কারণ থাকে। মাছির এই হাত ঘষা আমাদের কাছে হাস্যকর বা সাধারণ মনে হলেও, এটি তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তারা নিজেকে পরিষ্কার রাখতে গিয়ে আমাদের পরিবেশকে দূষিত করলেও, তাদের এই উচ্চতর সংবেদনশীলতা এবং গ্রুমিং পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের কাছে আজও এক গবেষণার বিষয়। মাছির জীবনযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কতটা সুশৃঙ্খল এবং সচেতন