'বার্নআউট জেনারেশন',অবিরত ব্যস্ততার চক্রে আটকে থাকা এক প্রজন্ম!

'বার্নআউট জেনারেশন',অবিরত ব্যস্ততার চক্রে আটকে থাকা এক প্রজন্ম!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

আমরা এমন এক সমাজে বড় হয়েছি যেখানে শেখানো হয়েছে, যে যত বেশি খাটবে, তত বেশি পাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য কোনো কথা। আমরা আমাদের আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি কাজ করছি, কিন্তু দিনশেষে আমাদের হাতে শুধুই থাকছে তীব্র অবসাদ আর শূন্যতা। অ্যান হেলেন পিটারসেনের ‘দ্য বার্নআউট জেনারেশন’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আধুনিক কর্মব্যস্ততা আসলে একটি ফাঁদ মাত্র।

বার্নআউট বলতে আমরা সাধারণত অতিরিক্ত কাজের ফলে সৃষ্ট ক্লান্তিকেই বুঝি। কিন্তু পিটারসেনের মতে, মিলিনিয়ালদের জন্য বার্নআউট কোনো সাময়িক অবস্থা নয়, এটি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা অপারেটিং সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে বিশ্রাম মানেই অপরাধবোধ, আর ব্যস্ততা মানেই হলো সাফল্য।

বইটির একটি চমৎকার পর্যবেক্ষণ হলো টাস্ক প্যারালাইসিস। আমাদের তালিকায় অনেক কাজ থাকে, কিন্তু আমরা কোনোটিই শুরু করতে পারি না।

যখন আমাদের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ অসংখ্য ছোট ছোট সিদ্ধান্তের, যেমন- কোন অ্যাপ ব্যবহার করব, কী খাব, সোশ্যাল মিডিয়ায় কী পোস্ট করব ইত্যাদির সম্মুখীন হয়, ঠিক  তখনই তার এক্সিকিউটিভ ফাংশন দুর্বল হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ডিসিশন ফ্যাটিগ। এর ফলে খুব সাধারণ কাজগুলোও আমাদের কাছে অসম্ভব কঠিন মনে হয় এবং আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি।

আগের প্রজন্মের মানুষদের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু স্মার্টফোন আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মজীবনের দেয়ালটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ইন্টারনেটের কারণে আমরা সবসময়ই সজাগ থাকি। ঘুমানোর আগে ইমেইল চেক করা বা ছুটির দিনে অফিসের মেসেজের উত্তর দেওয়া আমাদের অবচেতন মনকে এক সেকেন্ডের জন্যও শান্ত হতে দেয় না। এই নিরন্তর সজাগ থাকা আমাদের মস্তিষ্কের কর্টিসল বা মানসিক চাপের হরমোনের লেভেল বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে  দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তির জন্ম দেয়।

পিটারসেন দেখিয়েছেন কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ভেতরে সবকিছু নিখুঁত করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। আমরা কেবল কাজ করি না, আমাদের কাজ এবং জীবন কতটা পারফেক্ট তা অন্যদের দেখানোর চেষ্টাও করি। অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করা আমাদের ভেতরে এক ধরণের অতৃপ্তি তৈরি করে। এই পারফরম্যান্স বজায় রাখার চাপই আমাদের বার্নআউটের দিকে ঠেলে দেয়।

বইটিতে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে আমরা সবসময় মনে করি আমাদের আরও বেশি কাজ করতে হবে।

তাড়াহুড়ো করার সংস্কৃতিটা আমাদের শিখিয়েছে যে, যদি আমরা সফল না হই, তবে তার অর্থ হলো আমরা যথেষ্ট পরিশ্রম করছি না। এই চিন্তা আমাদের বিশ্রামের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আমরা এমনকি শখের কাজগুলোকেও, যেমন- রান্না বা বাগান করাকেও উপার্জনের মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রদর্শনের বস্তু বানিয়ে ফেলেছি।

বার্নআউট থেকে বাঁচার কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ: 
☞ ডিজিটাল ডিটক্স: প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা ফোন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে সব ধরণের স্ক্রিন বন্ধ করে দিন যাতে মস্তিষ্ক গভীর ঘুমের জন্য তৈরি হতে পারে।

☞ না’ বলতে শিখুন: সব কাজে হ্যাঁ বলা বা সব ইভেন্টে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। আপনার মানসিক শক্তি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে, তাই অপ্রয়োজনীয় সামাজিক বা পেশাদার চাপ এড়িয়ে চলুন।

☞ বিশ্রামকে সম্মান দিন: বিশ্রাম মানে সময় নষ্ট নয়। প্রোডাক্টিভিটি বজায় রাখার জন্য বিশ্রাম নেওয়া একটি জৈবিক প্রয়োজন। বিশ্রামকে আপনার দিনের কাজের তালিকার একটি অংশ হিসেবে দেখুন।

☞ লক্ষ্য ছোট করুন: একগাদা কাজের তালিকা না করে দিনে মাত্র ৩টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিন। ছোট সাফল্য আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়।

“দ্য বার্নআউট জেনারেশন” আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা কোনো যান্ত্রিক যন্ত্র নই যে সারাক্ষণ চলতে থাকব। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের মূল্য আমাদের কাজের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না।


সম্পর্কিত নিউজ