{{ news.section.title }}
কম্পিউটার আসার আগেই কোডিং? জানুন প্রথম নারী প্রোগ্রামারের ইতিহাস!
আজ আমরা যে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে পৃথিবী দেখছি, তার মূল বীজটি ১৮০০ শতকের এক ধুলোমাখা লন্ডনে বপন করা হয়েছিল। লর্ড বায়রনের কন্যা হয়েও কবিতার ছন্দ নয়, বরং গণিতের জটিল সমীকরণেই অ্যাডা খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের সুর। যখন চার্লস ব্যাবেজ কেবল একটি গণনা যন্ত্র তৈরির কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখন অ্যাডা লাভলেস দেখেছিলেন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ। তিনি বুঝেছিলেন, একদিন এই যন্ত্র কেবল সংখ্যা নয়, বরং সৃষ্টি করবে সুর আর ছবি।
চার্লস ব্যাবেজ তখন একটি যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন যার নাম ছিল অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন। এটিই ছিল আধুনিক কম্পিউটারের আদি রূপ। ১৮৪২ সালে একটি ইতালীয় গবেষণাপত্র অনুবাদ করার সময় অ্যাডা সেই যন্ত্রটির জন্য কিছু বিস্তারিত নোট বা ব্যাখ্যা যোগ করেন। সেই নোটের এক জায়গায় তিনি একটি বিশেষ গাণিতিক ধারা বের করার জন্য একটি নির্দিষ্ট ধাপ বা অ্যালগরিদম বর্ণনা করেন। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম। ব্যাবেজ কেবল যন্ত্রটি বানানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু অ্যাডা দেখিয়েছিলেন সেই যন্ত্রকে দিয়ে কীভাবে কাজ করাতে হয়।
অ্যাডা লাভলেস তাঁর চিন্তাধারাকে বলতেন পোয়েটিক সায়েন্স। ব্যাবেজ মনে করতেন তাঁর যন্ত্রটি কেবল যোগ বিয়োগের কাজে লাগবে। কিন্তু অ্যাডা বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি কোনো ডেটা বা তথ্যকে চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়, তবে সেই যন্ত্র দিয়ে কবিতা লেখা, ছবি আঁকা বা সুর তৈরি করাও সম্ভব।
আজকের দিনে আমরা যে মাল্টিমিডিয়া কম্পিউটার ব্যবহার করছি, তার মূল ধারণাটি অ্যাডা প্রায় ১৮০ বছর আগেই দিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে কম্পিউটার এক সময় মানুষের চিন্তার এক বিশাল মাধ্যম হয়ে উঠবে।
অ্যাডা লাভলেসের অবদান দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও ১৯৫০ এর দশকে অ্যালান টুরিংয়ের মতো বিজ্ঞানীরা তাঁর কাজ পুনরায় আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্মানে ১৯৭৯ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি শক্তিশালী কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের নাম রাখে 'Ada'। প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় মঙ্গলবার 'অ্যাডা লাভলেস ডে' পালন করা হয়, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীদের সাফল্য উদযাপন করার একটি আন্তর্জাতিক দিনে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই ভাবেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানের শুরুটা কেবল পুরুষদের হাত ধরেই। কিন্তু অ্যাডা লাভলেসের ইতিহাস প্রমাণ করে যে এই খাতের একদম গোড়াপত্তন হয়েছিল একজন নারীর মেধা দিয়ে। অ্যাডা শিখিয়ে গেছেন যে বিজ্ঞানের সাথে কল্পনার মিশ্রণ ঘটালে অসম্ভবকে জয় করা যায়। তিনি কেবল গণিতবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদও। অ্যাডা যখন প্রোগ্রামটি প্রথমবার লিখেছিলেন, তখনো কিন্তু অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন যন্ত্রটি বাস্তব রূপ পায়নি। অর্থাৎ, তিনি একটি কাল্পনিক যন্ত্রের জন্য পৃথিবীর প্রথম সচল কোড লিখেছিলেন।
অ্যাডা লাভলেস ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত চিন্তার অধিকারী। যেখানে মানুষ কেবল বাষ্পীয় ইঞ্জিন আর কলকারখানা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, সেখানে তিনি দেখেছিলেন ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য ডিজিটাল জগত। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে লিঙ্গ বা সময় কোনো বাধা নয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং সৃজনশীলতাই পারে পৃথিবীকে নতুন পথ দেখাতে। আজ আমরা যে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করছি, তার আদি অনুপ্রেরণা হিসেবে অ্যাডা লাভলেস চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।