{{ news.section.title }}
ভূমিকম্পের পর মানসিক আঘাত বা 'ট্রমা' জয় করার কার্যকর উপায়!
বড় কোনো ভূমিকম্পের হওয়ার পর মাটির কম্পন হয়তো কয়েক সেকেন্ডেই থেমে যায়, কিন্তু অনেকের মনেই সেই কম্পন চলতে থাকে দিনের পর দিন। দরজা বা জানালার সামান্য শব্দে চমকে ওঠা কিংবা বিছানায় শুয়েও মনে হওয়া যে এই বুঝি মাটি কেঁপে উঠল! এটি কেবল আপনার কল্পনা নয়, এটি আপনার মস্তিষ্কের এক জটিল সংকেত।
ভূমিকম্পের পর অনেকেরই মনে হয় বসা অবস্থায় বা শুয়ে থাকা অবস্থায় শরীর বা খাট কাঁপছে, যদিও বাস্তবে কিছুই ঘটছে না। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যান্টম আর্থকোয়েক (Phantom Earthquakes) বলা হয়। এরকম যখনই কাঁপছে মনে হবে, তখন স্থির হয়ে কোনো গ্লাসের পানির দিকে তাকান বা ঘরের ঝাড়বাতি বা ঝুলন্ত কোনো জিনিসের দিকে লক্ষ্য করুন। যদি সেগুলো স্থির থাকে, তবে নিজেকে বারবার বলুন, "এটি আমার মনের ভুল, আমি এখন নিরাপদ।" এই যুক্তিযুক্ত চিন্তা মস্তিষ্ককে শান্ত করতে সাহায্য করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা, মৃতদেহ বা আতঙ্কিত মানুষের ভিডিও বারবার দেখা ট্রমাকে আরও গভীর করে। আমাদের মস্তিষ্ক ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান তথ্য খুব দ্রুত গ্রহণ করে এবং তা ভয়ের স্মৃতি হিসেবে জমা রাখে। তাই নিউজ বা ভিডিও দেখা বন্ধ রাখুন। কেবল নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা জানুন। অতিরিক্ত নেতিবাচক তথ্য আপনার দুশ্চিন্তার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যখনই আতঙ্ক শুরু হবে, তখন শরীরকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনা জরুরি। এর জন্য '৫-৪-৩-২-১' গ্রাউন্ডিং মেথড ব্যবহার করুন এভাবে -
☞ আপনার চারপাশে এমন ৫টি জিনিস দেখুন যা দেখা যায়।
☞ ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন, যেমন- টেবিল বা কাপড়।
☞ ৩টি শব্দ শোনার চেষ্টা করুন, যেমন- ফ্যানের শব্দ বা পাখির ডাক।
☞ ২টি জিনিসের ঘ্রাণ নিন।
☞ ১টি ভালো জিনিসের কথা ভাবুন।
এই প্রক্রিয়াটি আপনার মস্তিষ্ককে ভয়ের জগত থেকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনবে।
অনিশ্চয়তাই আমাদের মনে ভয় জন্ম দেয়। আপনি যখন জানবেন বিপদে আপনার কী করণীয়, তখন ভয় অনেকটা কমে যায়। পরিবারের সবার সাথে বসে একটি জরুরি পরিকল্পনা করুন। একটি ইমার্জেন্সি ব্যাগ গুছিয়ে রাখুন,যেমন- শুকনো খাবার, পানি, টর্চ, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। যখন আপনি মানসিকভাবে এবং উপকরণগতভাবে প্রস্তুত থাকবেন, তখন আপনার অবচেতন মন নিজেকে নিরাপদ মনে করতে শুরু করবে।
ট্রমা বা ভয়কে মনের ভেতর চেপে রাখলে তা বিষফোড়ার মতো কাজ করে। কাছের বন্ধু বা পরিবারের মানুষের সাথে কথা বলুন। দেখবেন আপনার মতো অনেকেই একই রকম ভয় পাচ্ছেন। এই শেয়ারিং, মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তবে যদি দেখেন ১-২ সপ্তাহ পরেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বা ঘুমের তীব্র সমস্যা হচ্ছে, তবে দেরি না করে একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নিন।
টিপস :
☞ শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন: শিশুরা বড়দের দেখে ভয় শেখে। তাদের সামনে শান্ত থাকুন, তাদের জড়িয়ে ধরুন এবং আশ্বস্ত করুন যে তারা নিরাপদ। তাদের সাথে সহজ ভাষায় কথা বলুন।
☞ ট্রমা কাটাতে দ্রুত স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফিরে যাওয়া জরুরি। কাজ মনকে ব্যস্ত রাখে এবং মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়।
☞ ঘুমের অভাব মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। ঘুমানোর আগে হালকা গরম পানিতে গোসল বা বই পড়া মানসিক প্রশান্তি দেয়।
ভূমিকম্পের পর ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, এটি মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই ভয়কে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেওয়া যাবে না। মনে রাখবেন, দালানকোঠা মেরামতের মতোই মনের মেরামতও জরুরি। ধৈর্য ধরুন এবং নিজেকে সময় দিন।