স্ক্রিনের ওপারে অন্য মানুষ: কেন ইন্টারনেটে আমাদের ব্যক্তিত্ব বদলে যায়?

স্ক্রিনের ওপারে অন্য মানুষ: কেন ইন্টারনেটে আমাদের ব্যক্তিত্ব বদলে যায়?
ছবির ক্যাপশান, স্ক্রিনের ওপারে অন্য মানুষ: কেন ইন্টারনেটে আমাদের ব্যক্তিত্ব বদলে যায়?

আমাদের নিউজ ফিডগুলো শুধুমাত্র তথ্য নয়,বরং সাজানো হয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের এক বিশেষ দুর্বলতাকে টার্গেট করেই। প্রতিটি স্ক্রল করার সময় আপনার অজান্তেই মস্তিষ্ক একটি পুরস্কারের অপেক্ষায় থাকে। একে বলা হয় ইনফিনিট স্ক্রলিং সাইকোলজি।

অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট: বাস্তব জীবনে একজন মানুষ শান্ত হলেও প্রায়সমই অনলাইনে  আক্রমণাত্মক বা অনেক বেশি খোলামেলা কথা বলে থাকেন! একে বলা হয় ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট। অনলাইনে আমরা সরাসরি চোখের দিকে তাকাতে পারছি না। এই অদৃশ্যতা মানুষের ভেতরে থাকা সামাজিক বাধার দেয়াল ভেঙে দেয়। ফলে মানুষ এমন কথা বলে ফেলে যা সে সরাসরি বলার সাহস পেত না। এটি একদিকে যেমন মানুষের প্রতিভাকে বিকাশে সাহায্য করে, অন্যদিকে আবার সাইবার বুলিং বা ট্রলিংয়েরও জন্ম দেয়।

ডোপামিন লুপ ও লাইক-কমেন্টের নেশা:
প্রতিটি নোটিফিকেশন বা লাইক পাওয়ার পর আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি অনেকটা স্লট মেশিনের মতো। আমরা বারবার রিফ্রেশ করি কারণ আমরা জানি না এবার কী নতুন বা ভালো কিছু পাব। এই অনিশ্চয়তা আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরণের নেশা তৈরি করে, যাকে বলা হয় ভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ড মেকানিজম। এ কারণেই আমরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটিয়ে দিই।

পিছিয়ে পড়ার আতঙ্ক:
সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের সুন্দর মুহূর্ত বা অর্জনের ছবি দেখে আমাদের মনে হয়, সবাই বুঝি অনেক সুখে আছে। শুধু আমিই বোধহয় পিছিয়ে পড়ছি। এই FOMO বা পিছিয়ে পড়ার ভয় আমাদের সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে বাধ্য করে। এটি মানসিক অস্থিরতা, একাকীত্ব এবং বিষণ্নতা তৈরির অন্যতম একটি প্রধান কারণ। আমরা তখন নিজের জীবনের আনন্দ উপভোগ করার চেয়ে অন্যদের দেখানোর জন্য ছবি তোলাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

ইকো চেম্বার ও কনফার্মেশন বায়াস:
অনলাইনে আমরা যা দেখতে চাই, অ্যালগরিদম আমাদের ঠিক তাই দেখায়। ফলে আমাদের নিজস্ব মতামতগুলোই বারবার ফিরে আসে। একে বলা হয় ইকো চেম্বার। এটি মানুষের সহনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং তাকে উগ্রবাদী করে তুলতে পারে। কারণ সে অন্য কোনো ভিন্ন মত শোনার সুযোগ পায় না, যা তার পূর্ববর্তী ধারণাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।

সুস্থ ডিজিটাল জীবনের জন্য টিপস :
☞ ডিজিটাল কারফিউ: প্রতিদিন অন্তত ২ ঘণ্টা 'নো ফোন জোন' তৈরি করুন। বিশেষ করে ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে। এটি আপনার মস্তিষ্কের কর্টিসল লেভেল কমাতে সাহায্য করবে।

☞ সচেতন স্ক্রলিং: কোনো কিছু শেয়ার করার আগে নিজেকে ৫ সেকেন্ড প্রশ্ন করুন, ঘটনাটি  সত্য কি না! এটি কি কাউকে কষ্ট দেবে কি না। এই সামান্য বিরতিই  আপনার ডিসইনহিবিশন নিয়ন্ত্রণ করবে।

☞ নোটিফিকেশন ম্যানেজমেন্ট: অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন যাতে বারবার ডোপামিন হিট না হয়।

☞ বাস্তব সংযোগ: অনলাইন আড্ডার চেয়ে সামনাসামনি কফি বা হাঁটাচলার আড্ডাকে বেশি গুরুত্ব দিন। মানুষের চোখের চাহনি এবং কণ্ঠস্বর যে সামাজিক নিরাপত্তা দেয়, তা ইমোজিতে সম্ভব নয়।

সাইবার সাইকোলজি বোঝায় প্রযুক্তি আমাদের পরিচালনা করার আগে আমাদের উচিত প্রযুক্তিকে পরিচালনা করা। আমাদের অনলাইন আচরণ আমাদেরই ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই পারে ডিজিটাল জগতকে আমাদের জন্য অভিশাপ নয়, বরং একটি সৃজনশীল আশীর্বাদ হিসেবে গড়ে তুলতে।


সম্পর্কিত নিউজ