রোজায় গ্যাস্ট্রিককে বিদায় দিন! জানুন বিস্তারিত

রোজায় গ্যাস্ট্রিককে বিদায় দিন! জানুন বিস্তারিত
ছবির ক্যাপশান, রোজায় গ্যাস্ট্রিককে বিদায় দিন! জানুন বিস্তারিত

রমজানে গ্যাস্ট্রিক মানেই কি সব মজাদার খাবার বর্জন? একদমই নয়! বরং কৌশলী ইফতার আর পরিমিত সেহরিই পারে আপনার পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে। ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে ইফতারের পর হালকা হাঁটাচলা,ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলোই বড় আরাম এনে দিতে পারে। অনেকে ভাবেন গ্যাস্ট্রিকের বড়িই একমাত্র সমাধান, কিন্তু আপনি কি জানেন প্রাকৃতিক খাবারই যে আপনার পাকস্থলীর দেয়ালকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম!

রোজায় গ্যাস্ট্রিক কেন বাড়তে পারে?
আমাদের পাকস্থলী হজমের জন্য অ্যাসিড তৈরি করে থাকে। যখন দীর্ঘ সময় আমাদের পেটে খাবার থাকে না, তখনও কিছু পরিমাণ অ্যাসিড তৈরি হতে থাকে। পেটে খাবার না থাকলে এই অ্যাসিড কখনো কখনো পাকস্থলীর দেয়ালে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এর ফলে দেখা দিতে পারে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর, পেটে জ্বালাপোড়া, অস্বস্তি বা ব্যথা। আরেকটি কারণ হলো ইফতারের সময় একসঙ্গে অনেক বেশি ভারী বা তেলযুক্ত খাবার খাওয়া। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পরও  হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার পাকস্থলীর উপর চাপ সৃষ্টি করে।

ইফতার কীভাবে শুরু করা ভালো?
রোজা ভাঙার সময় ধীরে ধীরে খাবার শুরু করা শরীরের জন্য বেশি উপকারী। প্রথমে পানি বা হালকা পানীয় দিয়ে শুরু করা যায়। অনেকেই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন, কারণ এতে প্রাকৃতিক চিনি ও খনিজ থাকে যা দ্রুত শক্তি দেয়। আনাস (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) নামাযের আগে আধা-পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি তা না পেতেন তবে পূর্ণ পাকা (শুকনা) খেজুর দিয়ে এবং তাও যদি না পেতেন তবে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিতেন।’[আহমাদ, মুসনাদ ৩/১৬৪, আবূ দাঊদ ২৩৫৬, তিরমিযী ৬৯৬, ইবনে মাজাহ ২০৬৫ ]

তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি খেজুর পায়, সে যেন তা দিয়ে ইফতার করে। যে ব্যক্তি তা না পায়, সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হল পবিত্র।" [সহীহুল জামেউস সাগীর ৬৫৮৩]

খালি পেটে পাকস্থলীকে মিষ্টি জাতীয় খাবার দিলে তা অধিকরূপে গ্রহণ করে এবং এর দ্বারা, বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়।

রোযার ফলে আমাদের কলিজায় এক প্রকার শুষ্কতা আসে, তা প্রথমে পানি দিয়ে আর্দ্র করলে তারপর খাদ্য দ্বারা  পরিপূর্ণ করলে উপকার পাওয়া যায়। এ জন্য পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য উত্তম হল, প্রথমে একটু পানি পান করে তারপরে খেতে শুরু করা। তাছাড়া খেজুর ও পানিতে রয়েছে এমন বৈশিষ্ট্য,যা হার্টের উপকারিতায় প্রভাব ফেলে।[যাদুল মা‘আদ ২/৫০-৫১]

তবে কারো কাছে পানি ও মধু থাকলে, পানিকে প্রাধান্য দিয়ে পানি দ্বারা ইফতার করবে। কেননা রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘‘...... যে ব্যক্তি তা না পায়, সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হল পবিত্র।’’ অবশ্য পানি পান করার পর মধু খাওয়া দোষাবহ নয়।[আশ্শারহুল মুমতে’ ৬/৪৪২]

সুতরাং, খালি পেটে উপকারী বলে দাবী করে, প্রথমেই অন্য কোন জিনিস মুখে নিয়ে ইফতার করা সুন্নতের প্রতিকূল। প্রথমেই এক ঢোক পানি খেয়ে তারপর হালকা খাবার যেমন ফল, স্যুপ বা সহজপাচ্য কিছু খাওয়া যেতে পারে, তাতে দোষের কিছু নেই।

অতিরিক্ত ভাজাপোড়া কেন সমস্যা বাড়ায়?
ইফতারে অনেক সময় ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ বেশি থাকে। যেমন পিয়াজু, বেগুনি, সমুচা ইত্যাদি। এগুলো সুস্বাদু হলেও তেলে ভাজা খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। ফলে পাকস্থলীতে অস্বস্তি বা গ্যাসের সমস্যা বাড়তে পারে। পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং এর সঙ্গে ফল বা সবজি যুক্ত করা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সেহরিতে কী ধরনের খাবার খাওয়া উত্তম?
সেহরির খাবার এমন হওয়া উচিত, যা ধীরে শক্তি দেয় এবং পেট দীর্ঘ সময় ভরা রাখে। যেমন- ওটস বা লাল চালের ভাত, ডাল বা ডিম, দই, কলা বা অন্যান্য ফল শাকসবজি ইত্যাদি ধরনের বেশ কিছু খাবারে ফাইবার ও পুষ্টি বেশি থাকে, যা হজমকে সহায়তা করে।

পানি কম খেলে সমস্যা বাড়তে পারে!
রোজায় পানি গ্রহণের সময় সীমিত। কিন্তু ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।

পানি কম পান করলে হজম প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে যেতে পারে এবং  অস্বস্তি বাড়তে পারে।

দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস ও সমস্যা তৈরি করতে পারে!
অনেক সময় দীর্ঘ সময় ক্ষুধার পর মানুষ দ্রুত খাবার খেয়ে ফেলেন। এতে পাকস্থলী হঠাৎই অনেক খাবার গ্রহণ করে এবং হজমে সমস্যা হয়। ধীরে ধীরে, ভালোভাবে চিবিয়ে খাবার খাওয়া হজমকে সহজ করে।

কোন খাবারগুলো কিছুটা এড়ানো ভালো?
যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেশি, তাদের জন্য কিছু খাবার সীমিত রাখা উপকারী হতে পারে। যেমন- অতিরিক্ত ঝাল খাবার, খুব তেলযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত চা বা কফি, খুব বেশি টক খাবার ইত্যাদি  পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন বাড়াতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের গুরুত্ব!
রোজার সময় অনেকের ঘুমের সময়সূচি বদলে যায়। কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুমও হজমের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীরের স্বাভাবিক হরমোন ও পরিপাক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সহায়ক।

কখন সতর্ক হওয়া জরুরি?
যদি গ্যাস্ট্রিকের অস্বস্তি খুব বেশি হয়, বারবার বমি, তীব্র ব্যথা বা দীর্ঘদিন বুকজ্বালা থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এ ধরনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

রোজায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, ইফতারে অতিরিক্ত খাবার এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এই সমস্যাকে বাড়াতে পারে। তবে ইফতার ধীরে শুরু করা, পরিমিত খাবার খাওয়া, সেহরিতে পুষ্টিকর খাবার রাখা এবং পর্যাপ্ত পানি পান ইত্যাদি সহজ অভ্যাস মেনে চললে রোজার সময়ও পরিপাকতন্ত্র অনেকটা স্বস্তিতে থাকতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ