{{ news.section.title }}
কোকিলের অন্যের বাসায় ডিম পাড়ার আসল রহস্য!
বনের অরণ্যে কোকিলের মিষ্টি ডাক শুনে আমরা মুগ্ধ হই ঠিকই, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চতুরতার গল্প। নেই নিজের বাসা, নেই ডিমে তা দেওয়ার ধৈর্য, কোকিল কি তবে এক প্রতারক পাখি! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ব্রুড প্যারাসিটিজম, যা অনেকটা কোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলার সিনেমার গল্পের মতো।
পাখিদের জগতে বাসা তৈরি করা এবং ছানা লালন-পালন করা অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু কুকু বা কোকিল গোত্রীয় পাখিরা এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের রেখেছে মুক্ত। তারা অন্য পাখির বাসায় ডিম পেড়ে এক ধরনের পরজীবী আচরণ করে থাকে। তবে এটি কেবল অলসতা নয়, বরং টিকে থাকার এক চরম লড়াই। বিবর্তনের ধারায় তারা এমনভাবে নিজেদের উন্নত করেছে যে, অন্য পাখি বুঝতেই পারে না তার বাসায় এক অনুপ্রবেশকারী বেড়ে উঠছে।
কেন তারা নিজের বাসায় ডিম পাড়ে না?
কুকু পাখির এই আচরণের পেছনে প্রধানত তিনটি বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনীয় কারণ কাজ করে:
১. বিবর্তনীয় শক্তি সঞ্চয়: বাসা তৈরি করা, ডিমের তা দেওয়া এবং ছানাদের জন্য খাবার জোগাড় করা অনেক শক্তির অপচয় ঘটায়। কুকু পাখিরা এই শক্তি সঞ্চয় করে বেশি পরিমাণে ডিম পাড়ার জন্য। তারা নিজেদের পরিশ্রম অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এমন এক জীবন বেছে নিয়েছে যেখানে তাদের একমাত্র কাজ হলো উপযুক্ত বাসা খুঁজে বের করা এবং সুযোগ বুঝে ডিম পাড়া।
২. ছানার বেঁচে থাকার উচ্চ হার: কুকু পাখি সাধারণত এমন সব পাখির বাসা বেছে নেয় যেমন—কাক, চড়ুই বা বাবুই, যারা খুব পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল অভিভাবক। এই তথাকথিত পালক মা-বাবা নিজেদের ছানা মনে করেই কুকু পাখির ছানাকে বড় করে তোলে। ফলে কুকু পাখির বংশধররা নিজের প্রজাতির চেয়ে অন্য প্রজাতির আশ্রয়ে বেশি নিরাপদে বেড়ে ওঠে।
৩. শারীরিক গঠন ও ডায়েট: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কুকু পাখির খাদ্য তালিকায় এমন কিছু পোকামাকড় থাকে যা পূর্ণবয়স্ক পাখির জন্য উপযোগী হলেও সদ্যোজাত ছানার জন্য হজম করা কঠিন হতে পারে। তাই তারা তাদের ছানাদের এমন পাখির জিম্মায় রাখে যাদের খাদ্যাভ্যাস ছানাদের দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে।
কুকুর চতুর কৌশল:
কুকু পাখি কেবল ডিম পেড়েই খালাস নয়, তাদের এই মিশন সফল করার জন্য তারা কিছু অবিশ্বাস্য কৌশল অবলম্বন করে। যেমন:
☞ ডিমের নিখুঁত অনুকরণ।কুকু পাখির ডিমের রঙ, আকার এবং দাগ হুবহু সেই পাখির ডিমের মতো হয় যার বাসায় সে ডিম পাড়ছে। ফলে স্বাগতিক পাখি বা হোস্ট বার্ড নিজের আর অন্যের ডিমের পার্থক্য বুঝতে পারে না।
☞ কুকু পাখি সাধারণত মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ডিম পাড়ার কাজ শেষ করে ফেলে। যখন স্বাগতিক পাখি খাবারের সন্ধানে বাসা থেকে একটু দূরে যায়, তখনই কুকু পাখি অতর্কিতে হামলা চালায়।
☞ কুকু পাখি ডিম পাড়ার আগে ওই বাসার নিজের ডিমগুলোর একটি বা দুটি নিচে ফেলে দেয় বা খেয়ে ফেলে, যাতে সংখ্যা ঠিক থাকে এবং স্বাগতিক পাখির সন্দেহ না হয়।
☞ কুকু পাখির ছানা সাধারণত স্বাগতিক পাখির ছানাদের আগেই ডিম ফুটে বের হয়। জন্মের পরই এই অন্ধ ও লোমহীন ছানাটি সহজাত প্রবৃত্তি থেকে বাসার অন্য ডিম বা ছানাদের পিঠে করে ঠেলে বাসার বাইরে ফেলে দেয়। ফলে সে একাই সমস্ত খাবার এবং মনোযোগ পায়।
প্রকৃতি কাউকে বিনাযুদ্ধে ছেড়ে দেয় না। অনেক সময় স্বাগতিক পাখি বুঝতে পারে যে ডিমটি তার নয়। তখন তারা সেই ডিমটি ভেঙে ফেলে বা পুরো বাসাটিই ত্যাগ করে। এই যে দাতা পাখি আর পরজীবী কুকু পাখির মধ্যে বুদ্ধির লড়াই, একে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে বলা হয় এভোল্যুশনারি আর্মস রেস। এক পক্ষ নতুন কৌশল আবিষ্কার করে ধোঁকা দেওয়ার, অন্য পক্ষ শেখে সেই ধোঁকা ধরার।