সাগরের নিচে কনসার্ট! অতল থেকে আসা সুরের আসল মানে কী?

সাগরের নিচে কনসার্ট! অতল থেকে আসা সুরের আসল মানে কী?
ছবির ক্যাপশান, সাগরের নিচে কনসার্ট! অতল থেকে আসা সুরের আসল মানে কী?

নীল সমুদ্রের হাজার ফুট নিচে, যেখানে সূর্যের শেষ আলোটুকুও পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এক অদ্ভুত মায়াবী সুর প্রতিধ্বনিত হয়। কেউ একে বলেন সমুদ্রের কান্না, আবার কেউবা ভাবেন কোনো প্রাচীন দানবের আহ্বান! কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এটি আসলে বিশালাকার তিমির দেহ থেকে নিঃসৃত এক সুশৃঙ্খল সংগীত বা তিমির গান। নির্দিষ্ট ছন্দ আর সুরের এই অবিশ্বাস্য পুনরাবৃত্তি কি কেবলই শব্দের খেলা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো জগত! আজকের এই আলোচনাতে উন্মোচন করব এই সামুদ্রিক দানবদের গানের আড়ালে থাকা গভীর রহস্য।

সমুদ্রের নিচের গায়ক!
তিমি, বিশেষ করে হাম্পব্যাক হোয়েল (Humpback Whale) এবং নীল তিমি (Blue Whale), তাদের দীর্ঘ এবং জটিল গানের জন্য  বেশ পরিচিত। তিমির এই গান কয়েক মাইল থেকে শুরু করে কয়েক হাজার মাইল দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যেহেতু পানির নিচে আলো খুব কম থাকে, তাই দৃষ্টিশক্তির চেয়ে শ্রবণশক্তি তিমির বেঁচে থাকার জন্য বেশি কার্যকর। তাদের এই গান মূলত এক ধরনের সনিক ল্যাঙ্গুয়েজ বা শব্দভিত্তিক ভাষা।

কেন তিমি গান গায়? 
তিমির সংগীতের পেছনে মূলত রয়েছে তিনটি বড় উদ্দেশ্য! 
১. প্রজনন ও সঙ্গীকে আকর্ষণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধানত পুরুষ হাম্পব্যাক তিমিরাই দীর্ঘ সময় ধরে গান গায়। প্রজনন ঋতুতে তারা তাদের শক্তি, স্বাস্থ্য এবং বংশগতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে এই জটিল সুর ব্যবহার করে থাকে। এটি অনেকটা পাখিদের গানের মতো, যা স্ত্রী তিমিকে আকৃষ্ট করার একটি বিবর্তনীয় কৌশল। মজার ব্যাপার হলো, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব পুরুষ তিমি প্রায় একই ধরনের গান গেয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে আবার সেই গানের সুর বদলে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সাংস্কৃতিক বিবর্তন।

২. ইকোলোকেশন ও নেভিগেশন। সমুদ্রের অন্ধকার গভীরে পথ চলার জন্য তিমি শব্দ ব্যবহার করে। তাদের গানের প্রতিধ্বনি যখন পাহাড়, হিমশৈল বা কোনো বস্তুর গায়ে লেগে ফিরে আসে, তখন তারা বুঝতে পারে সামনে কী আছে। এটি অনেকটা আধুনিক রাডার বা সোনার সিস্টেমের মতো কাজ করে। তাদের নিচু কম্পাঙ্কের শব্দগুলো সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করে।

৩. সামাজিক যোগাযোগ ও পরিচয়। তিমিরা খুব সামাজিক প্রাণী। তারা দলের অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখতে এবং নিজের অবস্থান জানাতে গান গায়। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি তিমির গানের নিজস্ব সিগনেচার বা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে, যা দিয়ে দলের সদস্যরা একে অপরকে চিনতে পারে। এমনকি মা তিমি এবং তার ছানার মধ্যে যোগাযোগের জন্য মৃদু গুঞ্জন বা সুর ব্যবহৃত হয়।

তিমির গানের অনন্যতা:
নীল তিমির গান এতই নিচু কম্পাঙ্কের (১০ থেকে ৪০ হার্টজ) যে মানুষের কান অনেক সময় তা সরাসরি শুনতে পায় না। কিন্তু এই তরঙ্গগুলো পানির নিচে প্রায় ১০,০০০ মাইল পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে।

তিমির গানে সুনির্দিষ্ট থিম থাকে। তারা একেকটি থিম কয়েক মিনিট ধরে গায় এবং পুরো গানটি কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে পারে। এটি প্রকৃতির সবচেয়ে দীর্ঘ এবং জটিল সংগীতের একটি।

যদি প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো একদল তিমি নতুন কোনো সুর শেখে, তবে কয়েক বছরের মধ্যে সেই সুর আটলান্টিক মহাসাগরের তিমিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এটি প্রাণিজগতে তথ্যের বিশ্বায়নের এক অদ্ভুত উদাহরণ।

মানুষের সৃষ্টি যখন তিমির গানে বাধা!
বর্তমানে তিমির এই সংগীত এক বিশাল হুমকির মুখে। সমুদ্রের বিশাল জাহাজ, তেলের খনি খনন এবং সামরিক সোনারের উচ্চ শব্দ তিমির গানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শব্দ দূষণ এর ফলে তিমিরা পথ হারিয়ে ফেলে, একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অনেক সময় সমুদ্র সৈকতে আটকা পড়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলে।

তিমির এ সিম্ফনি রক্ষা করার অর্থ হলো মহাসাগরের প্রাণপ্রাচুর্যকে রক্ষা করা। আর কখনো যদি সমুদ্রের গর্জনের শব্দ শুনেন, বুঝে নিবেন, হয়তো অনেক গভীরে কোনো এক নীল তিমির হৃদয়ের সুর মাইলকে মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বকে নিজের অস্তিত্বের কথা জানান দিচ্ছে!
 


সম্পর্কিত নিউজ