অফিসে ঘুমালেই বাড়ে সম্মান! জাপানের ‘ইনেমুরি’ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন কি?

অফিসে ঘুমালেই বাড়ে সম্মান! জাপানের ‘ইনেমুরি’ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন কি?
ছবির ক্যাপশান, অফিসে ঘুমালেই বাড়ে সম্মান! জাপানের ‘ইনেমুরি’ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন কি?

অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং চলছে আর আপনার কলিগ আপনার সামনেই অঘোরে ঘুমাচ্ছেন! এমন দৃশ্য বাংলাদেশে হলে হয়তো চাকরি ধরে রাখাই দায় হয়ে যেত! কিন্তু জাপানে এটিই হলো পরম সম্মানের প্রতীক। জাপানিজ ভাষায় একে বলা হয় 'ইনেমুরি' (Inemuri)। সেখানে জনসমক্ষে বা কাজের মাঝে ঘুমানো মানে আপনি অলস নন, বরং আপনি এত বেশি পরিশ্রম করেছেন যে শরীর আর সায় দিচ্ছে না। কিন্তু জাপানিরা কেন এইরকম ঘুমানোকে কর্মদক্ষতার মেডেল মনে করে থাকে!

ইনেমুরি কী? 
ইনেমুরি হলো কাজের ফাঁকে বা যাতায়াতের পথে ছোট ছোট ঘুমের বিরতি। জাপানিজ সংস্কৃতিতে এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত আছেন কিন্তু মানসিকভাবে সাময়িক বিরতি নিচ্ছেন। অফিসের কোনো জুনিয়র কর্মী যদি তার টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে, তবে তার বস বা সহকর্মীরা ধরে নেন যে এই ব্যক্তিটি গত রাতে কাজ করতে করতে এতটাই ক্লান্ত যে সে এখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। অর্থাৎ, ঘুমটি এখানে তার পরিশ্রমের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর ব্রিজিট স্টেগার, যিনি জাপানিজ সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন, তার মতে, ইনেমুরি জাপানিদের কাছে একটি সামাজিক শিষ্টাচার। এখানে ব্যক্তিটি ঘুমের মধ্যেও এমন একটি ভঙ্গি বজায় রাখে যেন সে যেকোনো মুহূর্তে আবার কাজে ফিরে আসতে পারে। এটি বিছানায় ঘুমানোর চেয়ে আলাদা, কারণ বিছানায়  

ঘুমানোর মানে হলো সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া। কিন্তু ইনেমুরি হলো সমাজের মাঝেই একটু জিরিয়ে নেওয়া।

কেন জাপানে এটি জনপ্রিয়? 
জাপানে ইনেমুরি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বেশ কিছু গভীর সামাজিক কারণ রয়েছে।

জাপানে দীর্ঘ সময় কাজ করাকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। যারা ভোরে অফিসে যান এবং মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন, তাদের প্রতি সমাজের আলাদা ধরনের শ্রদ্ধা থাকে। ফলে ইনেমুরি প্রমাণ করে যে আপনি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়েছেন।

জাপানিজদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত ব্যস্ত। গড়পড়তা একজন জাপানিজ রাতে মাত্র ৬ ঘণ্টার মতো ঘুমান। এই ঘুমের ঘাটতি মেটাতে তারা ট্রেন, বাস বা মিটিংয়ের ফাঁকে ছোট ছোট ঘুমের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। জাপানিজ সমাজ মনে করে, কেউ যদি কাজ না করে অলস বসে থাকত তবে সে ঘুমাত না। সে যেহেতু ঘুমিয়ে পড়েছে, তার মানে সে অনেক কাজ করেছে।

ইনেমুরির ক্ষেত্রে একটি মজার নিয়ম রয়েছে। অফিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা বস চাইলে সবার সামনে ইনেমুরি করতে পারেন, কিন্তু একজন একেবারে নতুন কর্মীর জন্য এটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে সাধারণভাবে, সমাজ একে নেতিবাচক চোখে দেখে না।

ইনেমুরির অলিখিত নিয়মাবলী:
ইনেমুরি করার কিছু নিজস্ব শিষ্টাচার আছে যা জাপানিরা মেনে চলেন-

⇨ ভঙ্গি: আপনাকে এমনভাবে ঘুমাতে হবে যেন আপনি পাশের জনের অসুবিধা না করেন। যেমন: বাসে বা ট্রেনে কারো কাঁধে মাথা রাখা যাবে না। সাধারণত বসে থেকে মাথা নিচু করে ঘুমানোকেই ইনেমুরি বলা হয়।

আবার ইনেমুরির সময় আপনাকে এমন একটি মানসিক স্তরে থাকতে হবে যাতে বসের ডাক বা স্টেশনের ঘোষণা আসার সাথে সাথে আপনি জেগে উঠতে পারেন।

⇨স্থান: অফিস মিটিং, লাইব্রেরি, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা পার্কের বেঞ্চ, যেকোনো জনাকীর্ণ স্থানে এটি করা বৈধ।

উপকারিতা:
জাপানিদের এই 'ইনেমুরি' বা ঝিমুনির অভ্যাসকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫-২০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি ক্লান্তি দূর করে মনোযোগ বাড়ায় এবং সৃজনশীল চিন্তা করতে সাহায্য করে। জাপানিরা হয়তো অবচেতনভাবেই এই বৈজ্ঞানিক সুবিধাটি গত কয়েক দশক ধরে ভোগ করছে, যা তাদের বিশ্বসেরা শিল্পোন্নত জাতি হিসেবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

পাশ্চাত্য বা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অফিসে ঘুমানো মানেই হলো চাকরি হারানোর ঝুঁকি। কিন্তু জাপানের এই সংস্কৃতি আমাদের শেখায় যে, প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনশীলতা কেবল দীর্ঘ সময় চোখ খোলা রাখার ওপর নির্ভর করে না। 


সম্পর্কিত নিউজ