{{ news.section.title }}
স্তন্যপায়ী হয়েও ডিম পাড়ে প্লাটিপাস: মিলিয়ন বছর আগের জীবন্ত রহস্য!
কল্পনা করুন, এমন এক প্রাণীর কথা, যার ঠোঁট থাকবে হাঁসের মতো, লেজ বিভারের মতো, আর পাগুলো হবে উটপাখির মতো! অস্ট্রেলিয়ার জলাশয়ে যখন প্রথম প্লাটিপাস আবিষ্কৃত হয়, ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা একে ল্যাবরেটরিতে বানানো কোনো ভুয়া প্রাণী ভেবে ভুল করেছিলেন। কিন্তু আসল চমক তখনো বাকি ছিল। এটি স্তন্যপায়ী হওয়া সত্ত্বেও প্রজননের জন্য ডিম পাড়ে! বিবর্তনের কোন খেয়ালে এই অদ্ভুত প্রাণীর জন্ম! আজকের এ প্রতিবেদনে আমরা ব্যবচ্ছেদ করব প্লাটিপাসের সেই রহস্যময় জগত এবং জানাব কেন একে জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পাজল বলা হয়ে থাকে।
প্লাটিপাস কি সত্যিই স্তন্যপায়ী?
হ্যাঁ, প্লাটিপাস নিশ্চিতভাবেই স্তন্যপায়ী বা 'ম্যামাল' (Mammal) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা সন্তানকে নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে এবং এদের শরীরে লোম থাকে। প্লাটিপাসের ক্ষেত্রে এই দুটি বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। তবে এদের একটি বিশেষ উপদলে ভাগ করা হয় যাকে বলা হয় মনোট্রিম। পৃথিবীতে বর্তমানে কেবল প্লাটিপাস এবং একিডনা (Echidna), এই দুই প্রজাতির প্রাণীই মনোট্রিম হিসেবে টিকে রয়েছে। এরা স্তন্যপায়ী হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি সন্তান জন্ম না দিয়ে ডিম পাড়ে।
ডিম পাড়ার পেছনের বিবর্তনীয় রহস্য:
প্লাটিপাসের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের পুরনো ইতিহাসে। বিজ্ঞানীরা ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, প্লাটিপাস হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের এমন একটি আদিম শাখা যা প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে মূল ধারা থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়কার স্তন্যপায়ী প্রাণীরা আজকের সরীসৃপ বা পাখিদের মতোই ডিম পাড়ত। পরবর্তীকালে বিবর্তনের ধারায় অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী জরায়ুর মাধ্যমে সরাসরি সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করলেও, প্লাটিপাস তার আদিম বৈশিষ্ট্যগুলোকেই ধরে রেখেছে। এটি মূলত স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপদের মাঝামাঝি একটি জীবন্ত জীবাশ্ম। এদের ডিএনএ-তে যেমন স্তন্যপায়ীর বৈশিষ্ট্য আছে, তেমনি পাখি এবং সরীসৃপের জিনের উপস্থিতিও পাওয়া যায়।
অদ্ভুত প্রজনন ও স্তন্যদান প্রক্রিয়া
প্লাটিপাসের ডিম পাড়া এবং স্তন্যদানের পদ্ধতিটি বেশ বিচিত্র রকমের।
স্ত্রী প্লাটিপাস সাধারণত নদীর পাড়ে গর্ত খুঁড়ে সেখানে ১ থেকে ৩টি নরম চামড়ার মতো ডিম পাড়ে। তবে এদের ডিম পাখির ডিমের মতো শক্ত হয়না। প্রায় ১০ দিন তা দেওয়ার পর সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।
প্লাটিপাসের কোনো নিপল বা বাঁট নেই। এর বদলে এদের পেটের ত্বকে বিশেষ এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত এলাকা থাকে যেখান থেকে দুধ ঘামের মতো নিঃসৃত হয়। নবজাতক প্লাটিপাস মায়ের শরীরের লোম থেকে সেই দুধ চুষে নেয়। এটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আদিমতম স্তন্যদান পদ্ধতির একটি নিদর্শন।
ডিম পাড়া ছাড়াও প্লাটিপাসের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে। প্লাটিপাস পানির নিচে চোখ, কান এবং নাক বন্ধ করে শিকার করে। এদের ঠোঁটে হাজার হাজার সেন্সর থাকে যা শিকারের পেশি থেকে নির্গত অতি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে। এটি সাধারণত হাঙ্গর বা কিছু মাছের মধ্যে দেখা যায়। পুরুষ প্লাটিপাসের পেছনের পায়ে বিষাক্ত কাঁটা থাকে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বিষের উপস্থিতি অত্যন্ত বিরল। এই বিষ একজন মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট না হলেও প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। প্লাটিপাসের কোনো প্রকৃত পাকস্থলী নেই। এদের খাদ্যনালী সরাসরি অন্ত্রের সাথে যুক্ত। বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে এরা পাকস্থলী তৈরির প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছিল।
প্লাটিপাসের অস্তিত্ব আমাদের বিবর্তনের সেই সময়কার কথা মনে করিয়ে দেয় যখন স্তন্যপায়ীরা সবেমাত্র পৃথিবীতে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছিল। একে রক্ষা করা মানে হলো পৃথিবীর কোটি বছরের পুরনো এক ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা।