গরমে এসি চালিয়েও যেভাবে কম রাখা যায় বিদ্যুৎ বিল

গরমে এসি চালিয়েও যেভাবে কম রাখা যায় বিদ্যুৎ বিল
ছবির ক্যাপশান, গরমে এসি চালিয়েও যেভাবে কম রাখা যায় বিদ্যুৎ বিল

তীব্র গরমে এসি এখন অনেকের ঘরে প্রায় অপরিহার্য একটি যন্ত্র। তবে আরাম বাড়লেও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় অনেক পরিবারকে। সঠিক এসি নির্বাচন, ব্যবহার পদ্ধতি এবং কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে এসি ব্যবহার করেও তুলনামূলকভাবে কমানো যায় বিদ্যুৎ খরচ।

এসি কেনার আগে কী ভাবতে হবে, কীভাবে চালালে বিল কম আসতে পারে, আর কোন ভুলগুলো খরচ বাড়িয়ে দেয় - নিচে উল্লেখ করা  হলো 

এসি কেনার আগে যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি

ঘরের মাপ বুঝে এসি নির্বাচন
এসি কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘরের আকার। ছোট ঘরের জন্য বড় এসি নিলে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ হবে, আবার বড় ঘরে ছোট এসি লাগালে ঘর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগবে এবং যন্ত্রের ওপরও বাড়তি চাপ পড়বে। তাই ঘরের মাপ অনুযায়ী এসি নির্বাচন করাই সবচেয়ে ভালো।

স্টার রেটিং ও ইনভার্টার প্রযুক্তি দেখুন
বাজারে এখন ১ স্টার থেকে ৫ স্টার পর্যন্ত বিভিন্ন রেটিংয়ের এসি পাওয়া যায়। সাধারণ নিয়ম হলো-স্টার রেটিং যত বেশি, বিদ্যুৎ খরচ তত কম। একই সঙ্গে এখন ইনভার্টার এসির জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। আগের প্রযুক্তির এসির তুলনায় ইনভার্টার এসি কম বিদ্যুৎ খরচে ঘর ঠান্ডা রাখতে পারে। তাই বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ইনভার্টার এসি ভালো বিকল্প হতে পারে।

স্প্লিট নাকি উইন্ডো এসি
বাজারে সাধারণত দুই ধরনের এসি বেশি দেখা যায়-স্প্লিট এসি ও উইন্ডো এসি। স্প্লিট এসি তুলনামূলকভাবে কম শব্দ করে, দেখতে ভালো লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও সুবিধা দেয়। ঘরের ধরন ও বাজেট অনুযায়ী সঠিক নির্বাচন করলে বিলও কম আসতে পারে।

এসির বিল কীভাবে হিসাব করবেন

অনেকে মনে করেন, টন যত বেশি, এসির বিদ্যুৎ খরচও তত বেশি। আসলে টনের পরিমাণ মূলত ঘর ঠান্ডা করার ক্ষমতা বোঝায়। যেমন, দেড় টন এসিতে যদি ২.৫ কিলোওয়াট লেখা থাকে, তাহলে তা এক ঘণ্টা টানা চললে আনুমানিক ২.৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে। দিনে ৮ ঘণ্টা চালালে সেই হিসাবে মাসিক বিলের একটি ধারণা আগেই করা সম্ভব। তাই এসি কেনার সময় শুধু দাম নয়, সম্ভাব্য বিদ্যুৎ খরচের দিকটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এসি ব্যবহারের ৮ কার্যকর উপায়

১. নিয়মিত সার্ভিসিং ও সঠিক ইনস্টলেশন
এসি ঠিকমতো কাজ করাতে এবং বিদ্যুৎ খরচ কম রাখতে নিয়মিত সার্ভিসিং খুবই প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ধুলো জমে ফ্যান ও অন্যান্য অংশে চাপ পড়ে, ফলে যন্ত্র বেশি বিদ্যুৎ টানে। বিশেষ করে ধুলাবালিপূর্ণ এলাকায় ৩ থেকে ৪ মাস পরপর সার্ভিসিং করানো ভালো। একইভাবে ইনডোর ও আউটডোর-দুই ইউনিটই পরিষ্কার রাখতে হবে। সঠিকভাবে ইনস্টল না হলে বিল আরও বাড়তে পারে, তাই দক্ষ টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে এসি লাগানো জরুরি।

২. উপযুক্ত তাপমাত্রা নির্ধারণ করুন
অনেকে এসি চালিয়েই তাপমাত্রা খুব কমিয়ে দেন। এতে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হলেও কম্প্রেসারে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। শুরুতে কিছু সময় ১৬ ডিগ্রিতে কুইক কুল বা টার্বো মোড ব্যবহার করে পরে ২৪ থেকে ২৫ ডিগ্রিতে সেট করা যেতে পারে। সাধারণভাবে ২৪ ডিগ্রি অনেকের জন্য আরামদায়ক এবং তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী।

৩. এসির সঙ্গে সিলিং ফ্যান ব্যবহার করুন
এসি ও ফ্যান একসঙ্গে ব্যবহার করলে ঠান্ডা বাতাস ঘরের সব জায়গায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘর তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয় এবং এসির তাপমাত্রা তুলনামূলক একটু বেশি রেখেও আরাম পাওয়া যায়। ফলে বিদ্যুৎ খরচও কমে।

৪. থার্মোস্ট্যাট ও টাইমার ব্যবহার করুন
প্রোগ্রামেবল থার্মোস্ট্যাট বা টাইমার ব্যবহার করলে এসি সব সময় হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। নির্দিষ্ট সময় পর এসি বন্ধ হয়ে গেলে বা তাপমাত্রা নিজে থেকে সামঞ্জস্য হলে অপ্রয়োজনীয় খরচ অনেকটাই কমে যায়। রাতে ঘুমানোর আগে ১ বা ২ ঘণ্টার টাইমার সেট করে রাখা গেলে ঘর ঠান্ডা থাকবে, আবার এসিও সারা রাত চলবে না।

৫. দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখুন
এসি চালিয়ে দরজা-জানালা খোলা রাখলে বাইরের গরম বাতাস ঢুকে ঘর ঠান্ডা হতে দেরি হয়। এতে এসিকে বেশি সময় কাজ করতে হয় এবং বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যায়। তাই এসি চালানোর আগে ঘর ভালোভাবে বন্ধ আছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. ফিল্টার পরিষ্কার রাখুন
ফিল্টারে ময়লা জমে গেলে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং এসিকে বেশি শক্তি ব্যবহার করতে হয়। তাই মাসে অন্তত একবার ফিল্টার পরিষ্কার করা উচিত। এতে শুধু বিল কমে না, এসির আয়ুও বাড়ে।

৭. অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক্স বন্ধ রাখুন
টিভি, ওভেন, ড্রায়ার, ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বসহ অনেক ডিভাইস ঘরে তাপ তৈরি করে। ফলে এসি চালু থাকা অবস্থায় এসব যন্ত্র চালু থাকলে ঘর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগে। তাই এসি ব্যবহার করার সময় অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখাই ভালো।

৮. মোটা পর্দা ব্যবহার করুন
জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ও বাইরের গরম বাতাস ঘরে ঢুকলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। মোটা পর্দা ব্যবহার করলে এই তাপ প্রবেশ কমে, ফলে এসিকেও কম চাপ নিতে হয়। এতে বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কমে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখা দরকার
অনেকক্ষণ টানা এসি চালালে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বাড়া বা অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আর্থ্রাইটিসে ভোগা ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত। তাই বাইরে ও ভেতরের তাপমাত্রার পার্থক্য খুব বেশি না রাখাই ভালো।

দিনে কতক্ষণ এসি চালানো উচিত
এসি কতক্ষণ চালাবেন, তা নির্ভর করে ঘরের আকার, এসির টন এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর। শুধু রাতে আরামের জন্য ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা, আর সারা দিনের আরামের জন্য ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত চালানো যেতে পারে। তবে ২৪ ঘণ্টা একটানা চালানো সাধারণত সুপারিশযোগ্য নয়। মাঝেমধ্যে বিরতি এবং ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

টন অনুযায়ী ব্যবহার
১ টনের এসি সাধারণত ছোট ঘরের জন্য উপযোগী এবং দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চালানো যেতে পারে। আর ১.৫ বা ২ টনের এসি বড় ঘরের জন্য বেশি উপযুক্ত, যা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।

এসি বিস্ফোরণ বা পানি পড়ার ঝুঁকি কেন হয়

বিস্ফোরণের সম্ভাব্য কারণ
এসি বিস্ফোরণের পেছনে থাকতে পারে ইলেকট্রিক্যাল শর্ট সার্কিট, গ্যাস লিকেজ, কম্প্রেসরের অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, ক্যাপাসিটর বিস্ফোরণ, নিম্নমানের ইনস্টলেশন, খারাপ সার্ভিসিং বা ভেতরে ধুলো জমে যাওয়ার মতো সমস্যা। তাই এসি ব্যবহারে অবহেলা করা উচিত নয়।

এসি থেকে পানি পড়ার কারণ
অনেক সময় ড্রেন পাইপ ব্লক হয়ে যাওয়া, ইভাপোরেটর কয়েল ময়লা হওয়া, অতিরিক্ত ঠান্ডা হওয়া, ভুল ইনস্টলেশন, বেশি আর্দ্রতা, ড্রেন প্যানের সমস্যা বা রেফ্রিজারেন্ট কমে যাওয়ার কারণেও এসি থেকে পানি পড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ