অনলাইন ক্লাসে খেই হারিয়ে ফেলছেন? মনোযোগ ধরে রাখার বৈজ্ঞানিক কৌশল শিখুন!

অনলাইন ক্লাসে খেই হারিয়ে ফেলছেন? মনোযোগ ধরে রাখার বৈজ্ঞানিক কৌশল শিখুন!
ছবির ক্যাপশান, অনলাইন ক্লাসে খেই হারিয়ে ফেলছেন? মনোযোগ ধরে রাখার বৈজ্ঞানিক কৌশল শিখুন!

স্ক্রিনে শিক্ষকের লেকচার চলছে, অথচ আপনার মন পড়ে আছে সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো এক নোটিফিকেশনে। এই পরিচিত দৃশ্যটি আসলে অলসতা নয়, বরং এটি এক ভয়াবহ ডিজিটাল আক্রমণ! মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যাটেনশন ফ্র্যাগমেন্টেশন।

মস্তিষ্ক কেন হার মেনে যায়?
মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে চারপাশের পরিবেশ থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু যখন আমরা একটি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন আমাদের মস্তিস্ক একইসাথে দুটি জগতের সংকেত পায়। একটি হলো শিক্ষকের কণ্ঠ এবং অন্যটি হলো ডিভাইসের ভেতরের অজস্র প্রলোভন। একে বলা হয় কগনিটিভ ওভারলোড। যখন তথ্যের চাপ মস্তিষ্কের প্রসেসিং ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যায় এবং সহজে বিনোদনের দিকে ঝুঁকে যায়।গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবার যখন আমরা ক্লাসের মাঝখানে ফোন চেক করি, আমাদের মস্তিষ্ক ডোপামিন নামক এক ধরনের আনন্দদায়ক হরমোন নিঃসরণ করে। এই ডোপামিনের নেশায় আমরা বারবার পড়ার টেবিল থেকে ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাই। একবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পুনরায় সেই গভীর মনোযোগে ফিরে আসতে মানুষের গড়ে প্রায় ২৩ মিনিট সময় লেগে যায়। অর্থাৎ, একটি ছোট নোটিফিকেশনই পারে আপনার পুরো ক্লাসের সারমর্ম বোঝার ক্ষমতা নষ্ট করে দিতে।

শারীরিক ও মানসিক প্রভাব: 
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকলে আমাদের শরীর ও মনে এক ধরনের অবসাদ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় জুম ফ্যাটিগ। ভিডিও কলে যখন আমরা একসাথে অনেক মানুষের মুখ দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সবার অমৌখিক ভাষা পড়ার চেষ্টা করে, যা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। তাছাড়া স্ক্রিন থেকে নির্গত ব্লু-লাইট আমাদের চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং মস্তিস্কের মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে ঘুমের অভাব ঘটে এবং পরের দিনের ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মনোযোগ হারানোর পেছনে এই শারীরিক অস্বস্তিগুলোও সমানভাবে দায়ী। যখন শরীর ক্লান্ত থাকে, তখন মস্তিষ্ক কঠিন বিষয়গুলো এড়িয়ে সহজ বিনোদনের পথ খোঁজে।

মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল: 
অনলাইন ক্লাসে শতভাগ মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে কেবল ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কিছু কৌশলগত পরিবর্তনও। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইনিং। পড়ার টেবিল থেকে ফোনটি অন্য রুমে রাখা কিংবা ফোনের সব নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়া প্রাথমিক পদক্ষেপ।

মনোবিজ্ঞানীরা মনোটাস্কিং- এর ওপর জোর দেন। আমরা অনেকে মনে করি মাল্টিটাস্কিং করা ভালো, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের মস্তিষ্ক একবারে কেবল একটি গভীর কাজই করতে পারে। ক্লাস চলাকালীন ব্রাউজারের অন্য সব ট্যাব বন্ধ করে কেবল ক্লাসের উইন্ডোটি ফুল স্ক্রিনে রাখা উচিত। এতে মস্তিষ্ক অন্য কোনো ভিজ্যুয়াল উদ্দীপনা পায় না এবং পাঠে মনোনিবেশ করা সহজ হয়।

মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখার উপায়:
নিষ্ক্রিয়ভাবে কেবল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনোযোগ হারিয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তাই মনোযোগ ধরে রাখার সেরা উপায় হলো একটিভ নোট টেকিং। কিবোর্ডে টাইপ না করে খাতা-কলমে নোট নিলে হাতের স্পর্শ এবং মস্তিষ্কের চিন্তার একটি সমন্বয় ঘটে, যাকে বলা হয় সেন্সরি এনগেজমেন্ট।

শিক্ষক যা বলছেন, তা নিজের ভাষায় সংক্ষেপে লিখে ফেলার চেষ্টা করলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে এবং ডিস্ট্রাকশনের তেমন একটা সুযোগ পায় না। এছাড়া মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া বা পোমোডোরো টেকনিক (২৫ মিনিট কাজ ও ৫ মিনিট বিরতি) অনুসরণ করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় থাকে। বিরতির সময় স্ক্রিন থেকে দূরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করা বা দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।

ডিজিটাল ডিটক্স এবং শৃঙ্খলা:
অনলাইন ক্লাসের বাইরেও আমরা দিনের কতটা সময় স্ক্রিনের পেছনে কাটাচ্ছি, তার ওপর আমাদের মনোযোগের ক্ষমতা নির্ভর করে। সারাদিন রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখলে আমাদের মস্তিষ্কের অ্যাটেনশন স্প্যান বা মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায়। কারণ এই ভিডিওগুলো প্রতি ৫-১০ সেকেন্ডে নতুন নতুন উদ্দীপনা দেয়।

ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস করা বা স্ক্রিনহীন কোনো শখ গড়ে তোলা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী মনোযোগের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। অনলাইন ক্লাসে সফল হতে হলে আমাদের ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণে নিজে চলা যাবে না। শৃঙ্খলা এবং সঠিক পরিকল্পনাই পারে এই ডিজিটাল চ্যালেঞ্জকে একটি সফল শেখার অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করতে।


সম্পর্কিত নিউজ