{{ news.section.title }}
নিঃস্বার্থ হওয়া কি সত্যিই সম্ভব? জানুন পরোপকারের পেছনে থাকা বিস্ময়কর কথা!
আমরা যখন খবরের কাগজে দেখি যে একজন ব্যক্তি নিজের জীবন বাজি রেখে আগুনের শিখা থেকে অপরিচিত কাউকে উদ্ধার করছেন, অথবা কেউ নিজের শেষ সম্বলটুকু দান করে দিচ্ছেন, তখন আমাদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা 'মহানুভবতা' বলি। কিন্তু আধুনিক বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান এবং নিউরোসায়েন্সের কাছে এটি একটি বিশাল ধাঁধা। ডারউইনের "যোগ্যতমের জয়" বা 'সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট' তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাণীর উচিত কেবল নিজের টিকে থাকা এবং বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। তাহলে মানুষ কেন নিজের ক্ষতি করে অন্যের উপকার করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, পরোপকারিতা বা আল্ট্রুয়িজম আসলে আমাদের টিকে থাকার এক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল জৈবিক কৌশল।
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ডব্লিউ ডি হ্যামিল্টন একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যা 'কিন সিলেকশন' (Kin Selection) নামে পরিচিত। এই তত্ত্বানুযায়ী, পরোপকারিতা শুরু হয় নিজের ঘর থেকেই। মানুষ তার সন্তানদের জন্য জীবন দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এর কারণ তার সন্তানের মধ্যে তার নিজের ডিএনএ-র অন্তত ৫০ শতাংশ বিদ্যমান। একইভাবে ভাইবোন বা নিকট আত্মীয়দের সাহায্য করার মাধ্যমে আমরা আসলে পরোক্ষভাবে আমাদের নিজস্ব জেনেটিক উত্তরাধিকারকেই পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। বিবর্তনের এই খেলায় জয়ী হতে হলে কেবল নিজের বেঁচে থাকা যথেষ্ট নয়, বরং নিজের জিনের প্রতিলিপিগুলোকেও রক্ষা করতে হয়। এই সহজাত প্রবণতাই আমাদের মধ্যে ত্যাগের প্রথম বীজ বপন করে দেয়!
কিন্তু মানুষ কেবল আত্মীয়দেরই সাহায্য করে না, সে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জন্যও কাজ করে। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রিভার্স এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন 'রেসিপ্রোকাল আল্ট্রুয়িজম' (Reciprocal Altruism) বা পারস্পরিক পরোপকারিতা তত্ত্বের মাধ্যমে। আদিম সমাজে যখন মানুষ ছোট ছোট শিকারে যেত বা হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচতে চাইত, তখন একা থাকা ছিল মৃত্যুর শামিল। সেই সময় মানুষের মস্তিষ্কে একটি অঘোষিত চুক্তি তৈরি হয়ে যায়। আর তা অনেকটা এমন যে, "আজ যদি আমি তোমাকে বাঘের হাত থেকে বাঁচাই, তবে কাল তুমি আমাকে বাঁচাবে।" যারা এই ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতায় অংশ নিত, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা স্বার্থপরদের চেয়ে অনেকগুনে বেশি ছিল। আর হাজার হাজার বছরের এই অভ্যাসের ফলে আমাদের মস্তিষ্ক এখন এমনভাবে প্রোগ্রামড হয়ে গেছে যে, আমরা অবচেতনভাবেই অন্যের উপকার করতে পছন্দ করি। কারণ, সমাজবদ্ধভাবে থাকাই যে মানুষের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
'হেল্পার্স হাই' এবং সুখ হরমোনের ভূমিকা
পরোপকারিতা যে শুধু টিকে থাকার কৌশল তা কিন্তু নয়, এটি আমাদের শারীরিকভাবেও ভালো রাখে। নিউরোসায়েন্টিস্টরা দেখেছেন যে, মানুষ যখন স্বেচ্ছায় কোনো দান করে বা কাউকে সাহায্য করে,
তখন তার মস্তিষ্কের 'রিওয়ার্ড সেন্টার' সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কে প্রচুর পরিমাণে 'ডোপামিন' এবং 'অক্সিটোকিন' নিঃসরিত হয়। অক্সিটোকিনকে বলা হয় 'লাভ হরমোন' বা বন্ডিং হরমোন। এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস এবং সহমর্মিতা বাড়ায়। অন্যদিকে ডোপামিন আমাদের এক ধরনের আনন্দের অনুভূতি দেয়, যা অনেকটা নেশার মতো। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় 'হেল্পার্স হাই' (Helper’s High)। অর্থাৎ, আমরা অন্যের উপকার করি কারণ এটি আমাদের নিজেদেরও মানসিকভাবে সুখী এবং চাপমুক্ত রাখে। আমরা মূলত এমনভাবে তৈরি হয়েছি, যেন ভালো কাজ করলে আমাদের শরীর নিজেই আমাদের পুরস্কার দেয়।
সামাজিক মর্যাদা ও সিগন্যালিং থিওরি:
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরোপকারিতা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী 'সোশ্যাল সিগন্যাল'। আপনি যখন অন্যের জন্য সম্পদ বা সময় ব্যয় করেন, তখন সমাজে আপনার গুরুত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতাও বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি অন্যদের কাছে এই সংকেত পাঠায় যে আপনি একজন সামর্থ্যবান এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। প্রাচীন গোত্রগুলোতে যারা সবচেয়ে বেশি দানশীল বা সাহসী যোদ্ধা হিসেবে অন্যদের রক্ষা করত, তারাই পরবর্তীকালে নেতা হিসেবে নির্বাচিত হতো। এই মর্যাদা কেবল সামাজিক সম্মানই আনে না, এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তার জীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তাই স্বার্থহীন কাজগুলো আসলে পরোক্ষভাবে আমাদের সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি সূক্ষ্ম মাধ্যম।
অন্যের কষ্ট কেন নিজের মনে হয়?
মানুষের মস্তিষ্কে 'মিরর নিউরন' নামক এক অদ্ভুত স্নায়ুকোষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আপনি যখন কাউকে ব্যথায় কাতরাতে দেখেন বা কারো চোখে পানি দেখেন, তখন আপনার মস্তিষ্কের এই নিউরনগুলো এমনভাবে উদ্দীপিত হয় যেন আপনি নিজেই সেই কষ্টে ভুগছেন। এই জৈবিক প্রক্রিয়ার নামই হলো 'সহমর্মিতা' বা ইমপ্যাথি। অন্যের কষ্ট দেখে নিজের ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা দূর করার জন্যই মস্তিষ্ক আমাদের নির্দেশ দেয় সাহায্য করতে। অর্থাৎ, সহমর্মিতা আমাদের এমন একটি তাড়না দেয় যা আমাদের স্বার্থপর হতে দেয় না। মানুষের এই ইমপ্যাথিই তাকে প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্য থেকে আলাদা করেছে এবং একটি জটিল মানবিক সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
পরোপকারিতা কি সত্যিই স্বার্থহীন?
অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, যদি পরোপকার করলে নিজের আনন্দ হয় বা সামাজিক মর্যাদা বাড়ে, তবে কি একে সত্যিই স্বার্থহীন বলা যায়? দর্শনের এই বিতর্ক থাকলেও বিজ্ঞানের উত্তর হলো, ফলাফল যাই হোক না কেন, পরোপকারিতার পেছনের উদ্দেশ্যটি যদি অন্যের কল্যাণ করা হয়, তবেই তা আল্ট্রুয়িজম। মানুষের মস্তিষ্ক এবং শরীর এমনভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত যে, অন্যের ভালো করা ছাড়া নিজের সার্বিক সুস্থতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভবই বটে। আর বিবর্তন আমাদের শিখিয়েছে , শুধু নিজের কথা ভাবলে প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, অন্যদিকে সবার কথা ভাবলে সভ্যতা টিকে থাকবে। তাই স্বার্থহীনতা আসলে আমাদের প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকারই এক প্রকৌশল।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের মধ্যে পরোপকারিতার ধরণ বদলেছে। এখন হয়তো আমরা অপরিচিত কাউকে অনলাইনে তথ্য দিয়ে সাহায্য করছি বা কোনো মানবিক উদ্যোগে কন্টেন্ট শেয়ার করছি। তবে এর পেছনের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো সেই আদিমকালের মতোই রয়ে গেছে। পরোপকারিতা কোনো মহৎ আদর্শ এবং এটি আমাদের বেঁচে থাকার অক্সিজেনও বটে। একটি সমাজ যত বেশি একে অপরের প্রতি যত্নশীল হয়, সেই সমাজ তত বেশি সমৃদ্ধ হয়। তাই আমাদের ভেতরে থাকা এই সহজাত প্রবৃত্তিটিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং চর্চা করাই হবে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।