{{ news.section.title }}
মহাকাশে নতুন প্রতিবেশী! উপগ্রহ গ্যালাক্সি আবিষ্কার ও মহাবিশ্বের অদৃশ্য জালের রহস্য
ভাবুন তো, আপনি আপনার বাড়িতে বছরের পর বছর ধরে বাস করছেন অথচ জানতেনই না যে আপনার দেয়ালের ওপাশেই আরও অনেকগুলো পরিবার বাস করে! মহাকাশ বিজ্ঞানে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। আমাদের আকাশগঙ্গার সীমানায় হঠাৎ করেই হদিস মিলেছে বেশ কিছু নতুন উপগ্রহ ছায়াপথের।
গ্যালাক্সির পরিবার ও উপগ্রহের ধারণা:
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি মহাবিশ্বে একা নয়। এর চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট গ্যালাক্সি, যাদের আমরা সাটেলাইট গ্যালাক্সি বলি। ঠিক যেমন চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, এই ছোট গ্যালাক্সিগুলো আমাদের গ্যালাক্সির মহাকর্ষ বলের টানে এর চারপাশেই অবস্থান করে। সম্প্রতি উন্নত টেলিস্কোপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে মহাকাশবিজ্ঞানীরা এমন কিছু অতি-ম্লান গ্যালাক্সি শনাক্ত করেছেন, যা এতদিন আমাদের চোখের আড়ালে ছিল।
এই নতুন গ্যালাক্সিগুলো কেন অনন্য?
নতুন আবিষ্কৃত এই গ্যালাক্সিগুলো সাধারণ গ্যালাক্সির মতো নয়। এদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের বেশ অবাক করেছে। যেমন:
⇨ অতি-ম্লান বা আল্ট্রা-ফেইন্ট বামন গ্যালাক্সি:
এগুলো আকারে খুবই ছোট এবং এদের উজ্জ্বলতা এতই কম যে এগুলোকে খুঁজে পাওয়া ছিল অনেকটা খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতোই। এদের মধ্যে তারার সংখ্যা অনেক বেশি কম, কিন্তু এদের ভর তুলনামূলকভাবে খুব বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, এই গ্যালাক্সিগুলোর সিংহভাগই গঠিত হয়েছে ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) দিয়ে।
ডার্ক ম্যাটারের গবেষণাগার:
ডার্ক ম্যাটার এমন এক রহস্যময় বস্তু যা আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব অনুভব করা যায়। এই ছোট গ্যালাক্সিগুলো ডার্ক ম্যাটারে ঠাসা থাকে। ফলে এগুলোকে নিয়ে গবেষণা করলে বোঝা সম্ভব মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়ায় ডার্ক ম্যাটার কীভাবে কাজ করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো হলো মহাবিশ্বের ফসিল বা জীবাশ্ম, যা একদম শুরুর দিকের গ্যালাক্সি গঠনের ইতিহাস ধরে রেখেছে।
এই আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে তিনটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
১। মহাবিশ্ব স্থবির নয়, এটি পরিবর্তনশীল।
মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে একটি ক্যানিবাল বা রাক্ষুসে গ্যালাক্সি। এটি প্রতিনিয়ত তার চারপাশের ছোট ছোট উপগ্রহ গ্যালাক্সিগুলোকে নিজের ভেতরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই নতুন আবিষ্কৃত গ্যালাক্সিগুলো থেকে বোঝা যায় কীভাবে ছোট ছোট পুঞ্জীভূত মেঘ থেকে এক সময় বিশাল বড় বড় গ্যালাক্সি তৈরি হয়েছে। এটি মহাবিশ্বের 'শ্রেণিবিন্যাস গঠন' তত্ত্বকে সমর্থন করে।
২। নক্ষত্র গঠনের বিবর্তন। এই ছোট গ্যালাক্সিগুলোর নক্ষত্রগুলো অনেক পুরনো। এদের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন মহাবিশ্বের আদিম গ্যাস থেকে কীভাবে প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলো তৈরি হয়েছিল। এতে থাকা ভারী ধাতুর স্বল্পতা আমাদের বিগ ব্যাং-পরবর্তী সময়ের নক্ষত্র সৃষ্টির প্রক্রিয়ার পাঠ দেয়।
৩। আকাশগঙ্গার প্রকৃত আকার ও প্রভাব।
আগে ধারণা করা হতো মিল্কিওয়ের চারপাশে খুব অল্প কিছু গ্যালাক্সি আছে। কিন্তু নতুন নতুন আবিষ্কার প্রমাণ করছে যে আমাদের গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় প্রভাব বা 'হ্যালো' আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। এটি আকাশগঙ্গার মোট ভর গণনায় সাহায্য করছে।
আবিষ্কারের প্রযুক্তি: ডার্ক এনার্জি সার্ভে ও এআই
এই নতুন গ্যালাক্সিগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে ডার্ক এনার্জি ক্যামেরা (DECam) এবং চিলিতে অবস্থিত বিশাল টেলিস্কোপগুলোর মাধ্যমে। তাছাড়া বিজ্ঞানীরা এখন মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করছেন, যা কোটি কোটি তারার মাঝ থেকে সূক্ষ্ম প্যাটার্ন খুঁজে বের করে অত্যন্ত ছোট গ্যালাক্সির অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারে।
মহাবিশ্ব তার বিশালতা আর বৈচিত্র্য নিয়ে সবসময় আমাদের চমকে দেয়। এই ক্ষুদ্র প্রতিবেশীগুলোই হয়তো একদিন মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য,ডার্ক ম্যাটারের রহস্য উন্মোচন করবে।