{{ news.section.title }}
টেস্টিকুলারে শিরার ফোলা বা ভ্যারিকোশিল? জানুন কারণ ও ব্যথাহীন আধুনিক চিকিৎসা!
মনে মনে একবার ভাবুন তো, আপনার অণ্ডকোষের ভেতর একগুচ্ছ কেঁচো জট পাকিয়ে আছে! শুনতে অদ্ভুত লাগলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'ব্যাগ অফ ওয়ার্মস' বা ভ্যারিকোশিল। এটি কোনো গোপন রোগ নয়, বরং শিরার এক অস্বাভাবিক স্ফীতি যা ১৫% পুরুষের অজান্তেই তাদের শুক্রাণু ধ্বংস করে দিচ্ছে। পা ফুলে যাওয়ার মতো এই শিরাগুলো যখন অণ্ডকোষে রক্ত জমিয়ে ফেলে, ঠিক তখনই তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে আপনার প্রজনন ক্ষমতাকে তিলে তিলে নিস্তেজ করে দিতে শুরু করে।
ভ্যারিকোশিল হওয়ার কারণ:
আমাদের অণ্ডকোষে রক্ত সরবরাহ করার পর সেই রক্ত পুনরায় হৃদপিণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু শিরা থাকে, যাকে বলা হয় 'প্যাম্পিনিফর্ম প্লেক্সাস' (Pampiniform Plexus)। এই শিরাগুলোর ভেতরে একমুখী ভালভ থাকে, যা রক্তকে শুধুমাত্র ওপরের দিকে প্রবাহিত হতে দেয়। যখন এই ভালভগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে বা অকেজো হয়ে যায়, তখন রক্ত ওপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে এবং শিরার ভেতরে জমতে থাকে। ফলে শিরাগুলো ফুলে ওঠে এবং আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। মজার বিষয় হলো, প্রায় ৮৫-৯৫% ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি বাম দিকের অণ্ডকোষে দেখা দেয়, কারণ বাম দিকের শিরার গঠনগত বিন্যাস কিছুটা জটিল।
এটি কীভাবে বন্ধ্যত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
ভ্যারিকোশিল সরাসরি শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে তিনটি প্রধান উপায়ে।
১। তাপমাত্রা বৃদ্ধি: শুক্রাণু তৈরির জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে অন্তত ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকা দরকার। শিরা ফুলে রক্ত জমে থাকার ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত করে।
২। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: রক্ত জমে থাকায়, সেখানে টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান জমা হয়, যা শুক্রাণুর ডিএনএ-র ক্ষতি করে।
৩। রক্ত সঞ্চালনে বাধা: নতুন ও অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত অণ্ডকোষে পৌঁছাতে বাধা পায়, ফলে শুক্রাণুর সংখ্যা, নড়াচড়ার ক্ষমতা এবং গঠন নষ্ট হয়ে যায়।
লক্ষণসমূহ:
অনেক ক্ষেত্রে ভ্যারিকোশিলের কোনো ব্যথাই থাকে না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
⇨ অণ্ডকোষে অস্বস্তি: দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা ভারী কাজ করলে অণ্ডকোষে হালকা ব্যথা বা ভারি ভাব অনুভূত হওয়া। শুয়ে থাকলে এই ব্যথা সাধারণত কমে যায়।
⇨ শিরার দৃশ্যমানতা: অণ্ডকোষের থলি বা স্ক্রোটামের ওপর দিয়ে ফোলা শিরাগুলো দেখা যেতে পারে। অনেক সময় এটি দেখতে 'কেঁচোর থলি'র মতো মনে হয়।
⇨ আকারের পরিবর্তন: আক্রান্ত অণ্ডকোষটি অন্যটির তুলনায় আকারে কিছুটা ছোট হয়ে যেতে পারে।
⇨ বন্ধ্যত্ব: কোনো বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই কেবল সন্তান ধারণে সমস্যার কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে এটি ধরা পড়তে পারে।
রোগ নির্ণয় ও গ্রেডিং:
চিকিৎসকরা সাধারণত শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করে থাকেন। ভ্যারিকোশিলকে সাধারণত তিনটি গ্রেডে ভাগ করা হয়ে থাকে।
গ্রেড ১: কেবল নিঃশ্বাস আটকে পেটে চাপ দিলে (Valsalva maneuver) শিরা বোঝা যায়।
গ্রেড ২: দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হাত দিয়ে অনুভব করা যায়।
গ্রেড ৩: কোনো পরীক্ষা ছাড়াই খালি চোখে ফোলা শিরা দেখা যায়।
নিখুঁতভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকরা 'কালার ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড' করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
অপারেশন কি জরুরি?
সব ভ্যারিকোশিলের জন্য অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। তবে যদি প্রচণ্ড রকমের ব্যথা থাকে, অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যায় কিংবা বীর্য পরীক্ষায় শুক্রাণুর মান খারাপ আসে, তবে সার্জারি করা জরুরি।
আধুনিক পদ্ধতিগুলো হলো
⇨ মাইক্রোসার্জিক্যাল ভ্যারিকোসিলেক্টমি সবচেয়ে সফল ও নিরাপদ একটি পদ্ধতি।মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুলে যাওয়া শিরাগুলো বেঁধে দেওয়া হয় যাতে রক্ত সুস্থ শিরা দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
⇨ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, যা ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ব্যবহার করে এই অপারেশন করা হয়।
⇨ এম্বোলাইজেশন (Embolization) হলো একটি নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতি যেখানে শিরার ভেতর ক্যাথেটার ঢুকিয়ে বিশেষ কয়েল বা সলিউশন দিয়ে সমস্যাযুক্ত শিরাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভ্যারিকোশিল মানেই জীবন শেষ বা আর কখনো বাবা হওয়া যাবেনা এমনটা নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুক্রাণুর মান নাটকীয়ভাবে উন্নত হয় এবং প্রজনন ক্ষমতা ফিরে আসে।