দক্ষিণ এশিয়ার ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের শীর্ষে হুনজা ভেলি

দক্ষিণ এশিয়ার ভ্রমণপিপাসুদের  পছন্দের শীর্ষে হুনজা ভেলি
ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের হুনজা ভেলি | ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

উত্তর পাকিস্তানের দুর্গম পাহাড়ঘেরা অঞ্চল, কারাকোরাম পর্বতমালার কোল ঘেঁষে থাকা হুনজা ভ্যালি-এক সময় যার নাম উচ্চারণই ছিল দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের জন্য। আজ সেই হুনজা ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বরফঢাকা শৃঙ্গ, নীলাভ হ্রদ, সবুজ ফলের বাগান, শান্ত গ্রামীণ জীবন আর অনিন্দ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে এই উপত্যকা যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।

বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে (মে থেকে সেপ্টেম্বর) হুনজায় পর্যটকদের ঢল নামে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি ও সহজতর ফ্লাইট সংযোগ চালু হওয়ায় বাংলাদেশি পর্যটকদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ভ্রমণসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, “হুনজা এখন আর দূরের স্বপ্ন নয়, পরিকল্পিত সফরে এটি হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।”

পাহাড়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মিলনভূমি

হুনজা অবস্থিত পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে, কারাকোরাম হাইওয়ের ধারে। এক সময় এটি ছিল স্বাধীন রাজ্য; স্থানীয় মির শাসকদের ইতিহাস আজও ছড়িয়ে আছে দুর্গ ও প্রাচীন স্থাপনায়। করিমাবাদ শহর এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই অবস্থিত ঐতিহাসিক বালতিত ও আলতিত দুর্গ-যেগুলো শত শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী।

উপত্যকার এক পাশে সুউচ্চ রাকাপোশি, অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাসু কনস-তীক্ষ্ণ শৃঙ্গের জন্য পরিচিত এই পর্বতশ্রেণি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে অন্যরকম রূপ ধারণ করে। পরিষ্কার আকাশে বরফঢাকা শৃঙ্গগুলো এতটাই স্পষ্ট দেখা যায় যে অনেক পর্যটক একে “বাস্তবের চেয়ে ছবির মতো সুন্দর” বলে বর্ণনা করেন।
আতাবাদ লেক: দুর্যোগ থেকে সৌন্দর্যে রূপান্তর

২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিধসের ফলে সৃষ্টি হওয়া আতাবাদ লেক এখন হুনজার প্রধান আকর্ষণ। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত নীলাভ জলরাশি, চারপাশে খাড়া পাহাড়-দৃশ্যটি এক কথায় মুগ্ধকর। স্থানীয় নৌচালক হাসান আলী বলেন, “আগে এখানে ছিল ধ্বংসস্তূপ, এখন মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে শুধু এই লেক দেখতে আসে।”

গ্রীষ্মকালে লেকে স্পিডবোট, কায়াকিং ও জেট-স্কি জনপ্রিয় কার্যক্রম। অনেক পর্যটক কেবল লেকের ধারে বসে পাহাড়ের ছায়া আর পানির রঙ বদলানো দেখেই সময় কাটান।

গ্রীষ্ম কেন সেরা সময়?

গ্রীষ্মে হুনজার তাপমাত্রা সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। দিনে রোদ উজ্জ্বল হলেও বাতাস শীতল ও আরামদায়ক। বরফ গলে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বাড়ে, উপত্যকা ভরে ওঠে সবুজে। এ সময় ফলের বাগানে এপ্রিকট, চেরি ও আপেলের মৌসুম শুরু হয়।

ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন ও জুলাই সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়। তবে যারা তুলনামূলক কম ভিড় চান, তারা মে অথবা সেপ্টেম্বর বেছে নিতে পারেন। শীতকালে (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি) প্রবল তুষারপাতের কারণে অনেক রাস্তা বন্ধ থাকে, তাই প্রথমবার ভ্রমণের জন্য গ্রীষ্মই সবচেয়ে উপযোগী।

পর্যটকদের অভিজ্ঞতা: “স্বপ্নের মতো এক সপ্তাহ”

ঢাকার বাসিন্দা সফটওয়্যার প্রকৌশলী রেজওয়ান কবির সম্প্রতি হুনজা ঘুরে এসে বলেন, “আমরা সাধারণত নেপাল বা দার্জিলিংয়ের কথা ভাবি। কিন্তু হুনজার স্কেল অনেক বড়, পাহাড়গুলো বিশাল, আকাশ পরিষ্কার-একটা আলাদা অনুভূতি দেয়।”

চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমানের ভাষায়, “আতাবাদ লেকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, ছবির ভেতরে ঢুকে গেছি। স্থানীয় মানুষজনও খুব আন্তরিক।”

বিদেশি পর্যটকদের মধ্যেও ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভ্রমণকারীদের উপস্থিতি বাড়ছে। ইতালির পর্যটক মার্কো রিচি বলেন, “হুনজা এখনো বাণিজ্যিক পর্যটনের চাপে ভেঙে পড়েনি। এখানকার প্রকৃতি অনেকটাই অক্ষত।”

আশপাশের আকর্ষণীয় স্থান

হুনজাকে কেন্দ্র করে আশপাশেও রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। কারাকোরাম হাইওয়ে ধরে এগোলেই দেখা মিলবে পাসু গ্লেসিয়ার। কিছু দূরে খুঞ্জেরাব পাস-যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম আন্তর্জাতিক সড়কপথ। এছাড়া ঈগল’স নেস্ট ভিউপয়েন্ট থেকে পুরো হুনজা উপত্যকা এক নজরে দেখা যায়।

অনেক পর্যটক হুনজা সফরের সঙ্গে গিলগিট শহর বা স্কার্দুও যুক্ত করেন। ফলে এক সফরেই কারাকোরাম অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি উপভোগের সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের প্রশ্ন

পর্যটন বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নতুন হোটেল, গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁ ও ট্রাভেল সার্ভিস গড়ে উঠছে। তরুণ প্রজন্ম গাইডিং ও ট্যুর অপারেশনে যুক্ত হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন-অপরিকল্পিত পর্যটন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ ও পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। পরিবেশকর্মীরা পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশিদের জন্য কেন আকর্ষণীয়?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে ভ্রমণ সহজতর হয়েছে। সরাসরি ফ্লাইট ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় অনেকেই নতুন গন্তব্য হিসেবে হুনজাকে বিবেচনায় আনছেন। ভ্রমণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনপ্রিয় গন্তব্যের চেয়ে কম।

বাংলাদেশের পাহাড়প্রেমীরা সাধারণত সিলেট, বান্দরবান বা নেপালমুখী হন। কিন্তু হুনজার পর্বতশ্রেণির ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। যারা আলপাইন দৃশ্য, হিমবাহ, উঁচু শৃঙ্গ ও নির্মল আকাশের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণীয়।

ট্যুর অপারেটররা বলছেন, “৭ থেকে ১০ দিনের পরিকল্পিত সফরে ইসলামাবাদ, গিলগিট ও হুনজা মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ করা যায়। বাজেটও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।”

কীভাবে যাবেন, কী প্রস্তুতি নেবেন

ইসলামাবাদ থেকে সড়কপথে কারাকোরাম হাইওয়ে ধরে প্রায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টায় হুনজা পৌঁছানো যায়। এছাড়া গিলগিট পর্যন্ত আকাশপথে গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে যাওয়া যায়।

ভ্রমণের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি-

  • রাতের জন্য হালকা জ্যাকেট প্রয়োজন
  • পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের জন্য অভিজ্ঞ ড্রাইভার বেছে নেওয়া ভালো
  • উচ্চতায় অভ্যস্ত হতে প্রথম দিন বিশ্রাম নেওয়া উচিত
  • পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো জরুরি


ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ থাকলে হুনজা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম টেকসই পর্যটন মডেল হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুনজার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে এর অবস্থান আরও দৃঢ় হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা-উন্নয়ন যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট না করে। “আমরা চাই মানুষ আসুক, দেখুক, উপভোগ করুক। কিন্তু আমাদের পাহাড়, নদী ও সংস্কৃতি যেন অক্ষুণ্ন থাকে,” বলেন করিমাবাদের এক প্রবীণ বাসিন্দা।

প্রকৃতি, ইতিহাস ও শান্তির এক নতুন ভ্রমণ দিগন্ত

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, ইতিহাসের ছোঁয়া, আন্তরিক মানুষ আর তুলনামূলক সহজ ভ্রমণব্যবস্থা-সব মিলিয়ে হুনজা ভ্যালি এখন দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান পর্যটন তারকা। বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে এক নতুন অভিজ্ঞতার দুয়ার, যেখানে এক সফরেই দেখা মিলবে পাহাড়, হ্রদ, সংস্কৃতি ও শান্তির।

ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আর সেই পরিবর্তনের জন্য হুনজা হতে পারে এক অনন্য সূচনা।

 


সম্পর্কিত নিউজ