ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের জন্য পঞ্চগড়ে যেসব স্থানে যেতে পারেন

ঈদের ছুটিতে ভ্রমণের জন্য পঞ্চগড়ে যেসব স্থানে যেতে পারেন
ছবির ক্যাপশান, সবুজ ধানখেত ছাপিয়ে দৃষ্টি কাড়ল দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা | ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের একেবারে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। হিমালয় পর্বতমালার সান্নিধ্যে থাকায় একে বলা হয় ‘হিমালয়ের কন্যা’। শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকেই দেখা মেলে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র চূড়া। তিনদিক ভারতীয় সীমান্তে ঘেরা এই জনপদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস আর সীমান্তঘেঁষা বৈচিত্র্যে ভরপুর। ঈদের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা চাইলে ঘুরে আসতে পারেন শান্ত-স্নিগ্ধ এই জেলায়।

পঞ্চগড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন প্রধান আকর্ষণ হলেও জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের তালিকায় আছে-মির্জাপুর শাহী মসজিদ, মহারাজার দিঘী, সমতলের চা বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, রকস মিউজিয়াম, তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো এবং বোদেশ্বরী মন্দির। যারা ইতিহাস-প্রীতি, প্রকৃতি-ছোঁয়া আর সীমান্তের আলাদা আবহ-সব একসঙ্গে চাইছেন, তাদের জন্য পঞ্চগড় একদম ‘কম ভিড়ের’ সুন্দর গন্তব্য।

১) মুঘল স্থাপত্যের সাক্ষী: মির্জাপুর শাহী মসজিদ

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে মির্জাপুর শাহী মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। জেলাশহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। শিলালিপি ও স্থাপত্যরীতি বিশ্লেষণ করে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ধারণা করেন, ১৬৫৬ সালে মুঘল আমলে এটি নির্মিত হয়। কারও মতে মালিক উদ্দিন, আবার কারও মতে দোস্ত মোহাম্মদ নামের একজন ব্যক্তি নির্মাণকাজ শেষ করেন।

মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। একই সারিতে তিনটি গম্বুজ, কোণায় মিনার-সব মিলিয়ে মুঘল স্থাপত্যরীতির ছাপ স্পষ্ট। দেয়ালের টেরাকোটার নকশাগুলোও আলাদা আলাদা কারুকাজে গড়া-একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। ইতিহাস ও স্থাপত্য-দুটো ভালোবাসেন যারা, তাদের জন্য এটি অবশ্যই দেখার মতো জায়গা।

মুক্ত আলোচনা : মোগল আমলের স্থাপত্য মির্জাপুর শাহী মসজিদ

 

২) ভিতরগড়ের প্রাচীন স্মৃতি: মহারাজার দিঘী

পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের ভিতরগড় এলাকায় প্রায় ৫৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মহারাজার দিঘী। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই জলাধার ঘিরে রয়েছে পৃথু রাজা ও ভিতরগড় দুর্গনগরীর ইতিহাস।

ইটবাঁধানো ১০টি ঘাট, প্রায় ২০ ফুট উঁচু পাড় এবং সবুজ গাছপালায় ঘেরা দিঘির পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের দারুণ টানে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পৃথু রাজা আত্মমর্যাদা রক্ষায় পরিবারসহ এই দিঘিতে আত্মাহুতি দেন। সেই জনশ্রুতি আর প্রাচীন নগর-ইতিহাসের সূত্র ধরেই মহারাজার দিঘী এখনো দর্শনার্থীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ।

 

শিক্ষক বাতায়ন

 

 

৩) উত্তরবঙ্গের সবুজ ঢেউ: সমতলের চা বাগান

অনেকে ভাবেন চা বাগান মানেই পাহাড়-কিন্তু পঞ্চগড়ের চা বাগান সমতলে। সারি সারি চা গাছ, বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ, আর দূরে মেঘ-এই দৃশ্যই আলাদা এক প্রশান্তি দেয়। ২০০০ সালে এই জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। কাজী এন্ড কাজী, এমএমটি, স্যালিলনসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির টি স্টেট/চা বাগান এলাকায় ঘুরলে সমতলের চায়ের নতুন পরিচয় মিলবে।

যারা পরিবার নিয়ে গেলে ছবির স্পট চান-চা বাগানের সরু পথ, সবুজ সারি, বিকেলের আলো-সবই কাজের। তবে চা-বাগান এলাকায় ভ্রমণে স্থানীয় নির্দেশনা মানা, ব্যক্তিগত জমি/কারখানা অংশে না ঢোকা-এগুলো খেয়াল রাখা ভালো।

সমতলে চায়ের স্বর্গ পঞ্চগড়

 

৪) সীমান্তের একেবারে কাছে: বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট

তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টকে বলা হয় বাংলাদেশের মানচিত্রের সূচনা বিন্দু। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখার পাশে দাঁড়িয়ে একইসঙ্গে সীমান্তের আবহ আর প্রকৃতির খোলা দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

অনেক সময় বিশেষ আয়োজন হিসেবে বিজিবি-বিএসএফের যৌথ প্যারেড/রিট্রিট সিরিমনি হয়-যা দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় হয়। কাছেই ভারতের ফুলবাড়ী আইসিপি এলাকার সংযোগ এবং সীমান্ত-ঘেঁষা জনপদের ‘জিরো পয়েন্ট’ অনুভূতি-সব মিলিয়ে বাংলাবান্ধা ভ্রমণ অনেকের কাছে পঞ্চগড় ট্রিপের “হাইলাইট” হয়ে ওঠে।

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, পঞ্চগড় - ভ্রমণ গাইড

৫) দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর: রকস মিউজিয়াম

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে গড়ে উঠেছে রকস মিউজিয়াম-অনেকের ভাষায় দেশের একমাত্র/প্রথম পাথরের জাদুঘর। এখানে প্রায় এক হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে-বিভিন্ন ধরনের শিলা, নুড়িপাথর, খনিজবালি, প্রাচীন ইট, পোড়ামাটির মূর্তি, মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের মুদ্রাসহ নানান জিনিস। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এটি এক অনন্য জ্ঞানভাণ্ডার, আর সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য “পঞ্চগড়ের ভূ-প্রকৃতি” বুঝে নেওয়ার দারুণ জায়গা।

পাথরের জাদুঘর ঘুরে এসে...

৬) নদীর ধারে ‘ভিউ-পয়েন্ট’: তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো

তেঁতুলিয়া উপজেলা শহরেই সীমান্তবর্তী মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষে ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো অবস্থিত। ভিক্টোরিয়ান রীতিতে কুচবিহারের রাজা ভূমি থেকে প্রায় ১৫-২০ মিটার উঁচু গড়ের ওপর এই ডাক বাংলোটি নির্মাণ করেছিলেন-এমন বর্ণনা বিভিন্ন ভ্রমণ-তথ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নদীর সৌন্দর্য, আর হেমন্ত-শীতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখার সম্ভাবনা-এই দুই কারণে তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো পর্যটকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।

এখন এটি জেলা পরিষদের অধীনে থাকা জায়গা-পাশে পিকনিক কর্ণারও আছে। তাই পরিবারের সঙ্গে বসে সময় কাটানো, নদীর ধারে হাঁটা, আর ফ্রেমভরা ছবি-সবই করা যায় এখানে।

৭) প্রাচীন তীর্থভূমি: বোদেশ্বরী মন্দির

বোদা উপজেলার করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত বোদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির। প্রায় ২ দশমিক ৭৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে বোদা উপজেলার নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কারুকার্যমণ্ডিত মন্দির এলাকা, তীর্থ-আবহ, উৎসবের সময় ভিড়-সব মিলিয়ে এটি পঞ্চগড়ের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানের একটি।

বোদেশ্বরী মন্দির – Bodeshwari Temple – Panchagarh.info

যেভাবে যাবেন: বাস ও ট্রেন

বাসে: ঢাকার শ্যামলী, গাবতলী ও মিরপুর থেকে নাবিল পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন বাসে সরাসরি পঞ্চগড় যাওয়া যায়। ভাড়া নন-এসি ৯০০-১১০০ টাকা এবং এসি ১৭০০-১৯০০ টাকার মধ্যে (পরিবহনভেদে ভিন্ন হতে পারে)।

ট্রেনে: কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসে যাতায়াত করা যায়। শ্রেণিভেদে ভাড়া ৭৪০ থেকে ২৫৯৮ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় থাকবেন: পঞ্চগড় শহরে থাকার বিকল্প

পঞ্চগড় জেলা শহরে সেন্ট্রাল গেস্ট হাউজ, হোটেল মৌচাক, হোটেল রাজনগর, হিলটন বোর্ডিং, এইচ কে প্যালেস ও হোটেল প্রীতমসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি রেস্ট হাউস এবং তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে আগাম বুকিংয়ের মাধ্যমে থাকা যায়-যদি অনুমোদন/সিট খালি থাকে।


সম্পর্কিত নিউজ