৫০ সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব, দলগুলোর প্রস্তুতি তুঙ্গে

৫০ সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব, দলগুলোর প্রস্তুতি তুঙ্গে
ছবির ক্যাপশান, জাতীয় সংসদ ভবন । ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে দলগুলোর ভেতরে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। আসনগুলো সরাসরি জনগণের ভোটে নয় - দলগুলোর সাধারণ আসনে পাওয়া সংখ্যার আনুপাতিক হারে বণ্টিত হয়, তারপর সংসদ সদস্যদের ভোটে নারী সদস্য নির্বাচিত হন। এই কারণে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসন বরাবরই বড় আলোচনার বিষয় - এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

বিএনপিতে তৎপরতা: ‘প্রোফাইল’ বানিয়ে পাঠানো, যোগাযোগ বাড়ানো

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে। অনেকে নিজেদের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রোফাইল/বৃত্তান্ত তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠাচ্ছেন। পাশাপাশি কেউ কেউ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের নাম আলোচনায় রাখতে চেষ্টা করছেন।

তবে দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের দাবি - নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারী আসন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। একই ইঙ্গিত দেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর - তিনি বলেছেন, ঈদের আগে সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

কার ভাগে কত আসন: আনুপাতিক বণ্টনে বিএনপি এগিয়ে

এবারের নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পাওয়ায় আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টির মধ্যে দলটি ৩৫টি নারী আসন পাওয়ার পথে  - এমন হিসাবই বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি, আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১টি আসন পাবে বলে আলোচনা রয়েছে। বাকি ৩টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টিত হবে।

ছোট দলগুলোর মধ্যে যাদের নাম ঘুরছে - বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল।

৫০ আসন কীভাবে বণ্টন হয়: নিয়মটা কী

সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০। সাধারণভাবে প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের কথা বলা হয়। বাস্তবে বণ্টন হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে - দল বা জোট সাধারণ আসনে যতটা শক্তিশালী, সংরক্ষিত নারী আসনেও তাদের ভাগ ততটাই বড় হয়। ভগ্নাংশের কারণে মোট বণ্টনে হেরফের হলে আইনে কিছু ক্ষেত্রে লটারির বিধানও আছে।

কবে হবে নির্বাচন: আইন বলছে ৯০ দিনের ভেতরে

আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে মনোনয়ন, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে। অর্থাৎ সময় হাতে থাকলেও প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে কমিশনের তফসিল-ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে কয়েকটি গণমাধ্যম বলছে, নির্বাচন কমিশন রমজানের মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে - তফসিল “শিগগিরই” আসতে পারে।


বিএনপিতে কারা আলোচনায়: নবীন–প্রবীণ মিশ্রণের ইঙ্গিত

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ইঙ্গিত মিলেছে - এবার সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে নবীন–প্রবীণের মিশ্রণ থাকতে পারে। অপেক্ষাকৃত তরুণদের বড় একটি অংশকে দেখা যেতে পারে - এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।

আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের মহিলা দল ও বিএনপি নেত্রী, সাংগঠনিক কর্মী এবং পরিচিত মুখদের নাম শোনা যাচ্ছে - যেমন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার (রানু), ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীনসহ আরও অনেকে।

বেবী নাজনীন সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেছেন, “আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি না,  তবে যাঁরা এ পদ দাবি করার যোগ্য, অবশ্যই তাঁদের নাম লিখবেন।”

সাবেক ছাত্রদল নেত্রীদের আগ্রহ: ‘যোগ্যতা + মাঠের কাজ’ যুক্তি

এবার শুধু মহিলা দল নয় - ছাত্রদল থেকে উঠে আসা সাবেক নারী নেত্রীদের মধ্যেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক। তাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে প্রোফাইল প্রস্তুত করে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পাঠিয়েছেন। আলোচনায় আছেন মহিলা দলের সহ–স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া)সহ আরও নাম।

সাবেক ছাত্রদল নেত্রী সুলতানা জেসমিনের মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে - রাজনীতিতে শ্রম-ঘামের সঙ্গে একাডেমিক যোগ্যতার সমন্বয় থাকা দরকার বলে তিনি মত দেন।


জামায়াতেও প্রস্তুতি: মহিলা বিভাগ থেকে খসড়া তালিকা

সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করার কাজ জামায়াতেও চলছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মহিলা বিভাগ থেকে একটি খসড়া তালিকা চাওয়া হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, সংসদে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন - এমন উপযুক্ত নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্য থেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও দলীয় ভেতরে শোনা যাচ্ছে। আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, আইনজীবী সাবিকুন্নাহার, মার্জিয়া বেগম, প্রভাষক মারদিয়া মমতাজের নাম উঠে এসেছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী থেকেও একজনকে মনোনয়নের সম্ভাবনার কথাও দলীয় একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন।

এনসিপি: এক আসনে দুই নাম ঘুরছে

এনসিপি সংরক্ষিত নারী আসনে একজনকে পাঠাতে পারবে - এমন হিসাবের ভিত্তিতে দলটির ভেতরও আলোচনা চলছে। এই পদের জন্য আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মাহমুদা আলম (মিতু)।


সংসদের প্রথম অধিবেশন: কবে বসছে - এটাই এখন সময়ের প্রশ্ন

সংরক্ষিত নারী আসনের প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের সময়সূচিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে হয় (প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী)। এবারের নির্বাচনের বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে ১৩ ফেব্রুয়ারি - সে হিসেবে ১৪ মার্চের মধ্যে প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতার কথাও আলোচনায় আছে।


নারী প্রতিনিধিত্বের বাস্তব চিত্র: সরাসরি নির্বাচনে সংখ্যা কম, সংরক্ষিত আসনে বাড়বে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। জয়ী হয়েছেন ৭ জন - এর মধ্যে ৬ জন বিএনপির, ১ জন স্বতন্ত্র। সংরক্ষিত ৫০টি আসন যুক্ত হলে সংসদে মোট নারী সদস্য হবেন ৫৭ জন - ৩৫০ সদস্যের সংসদে যা প্রায় ১৬ শতাংশের মতো।

ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরীও মনে করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নেতা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তিনি বলেছেন - দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, এবং যোগ্যতা–অভিজ্ঞতা–মাঠের ভূমিকা বিবেচনায় মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে বলে তিনি আশা করেন।


কেন এবারের সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে আলোচনা বেশি

এবারের প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত নারী আসনের রাজনৈতিক গুরুত্ব কয়েক কারণে বেড়েছে - 

  • সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী এমপি সংখ্যা কম, ফলে সংরক্ষিত আসনই প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রধান ভরসা।
  • দলগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা ও নতুন মুখ - দুই দিক সামলে তালিকা সাজাতে চাইছে, কারণ সংসদীয় কাজ, কমিটি ও আইন প্রণয়ন - সব জায়গায় দক্ষ প্রতিনিধিত্ব জরুরি।
  • সংরক্ষিত আসন ঘিরে দলগুলোর ভেতর আঞ্চলিক ভারসাম্য, পেশাগত বৈচিত্র্য (শিক্ষক/আইনজীবী/চিকিৎসক/সংগঠক), এবং দলীয় আন্দোলনে ভূমিকা - এসব বিবেচনার চাপও বাড়ছে।


সামনের কয়েক সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা এবং দলগুলোর চূড়ান্ত তালিকা - দুইটিই ঠিক করে দেবে সংরক্ষিত নারী আসনের “চিত্র” কেমন হবে। বিএনপিতে প্রোফাইল পাঠানো আর যোগাযোগ বাড়ানোর যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের মহিলা বিভাগের খসড়া তালিকা, আর এনসিপির এক আসন ঘিরে দুই নাম - সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসন শুধু “কাগুজে” হিসাব নয়; এটি দলগুলোর ভেতরের সাংগঠনিক শক্তি, নতুন নেতৃত্ব গড়া এবং সংসদে কার্যকর নারী প্রতিনিধিত্বের পরীক্ষাও।


সম্পর্কিত নিউজ