পিলখানা হত্যাকাণ্ডে আসামি করা হচ্ছে হাসিনাসহ আওয়ামী মন্ত্রী-এমপিদের

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে আসামি করা হচ্ছে হাসিনাসহ আওয়ামী মন্ত্রী-এমপিদের
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক হত্যাকাণ্ড - ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি। বিডিআর বিদ্রোহ সংক্রান্ত বিস্ফোরক আইনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আসামি করার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দিতে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসায় নতুন করে তদন্ত ও আসামি তালিকা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

২০০৯ সালের পিলখানা: বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরে ঘটে এক নৃশংস বিদ্রোহ। দাবি-দাওয়া ও বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষের জেরে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেন।

সকাল ৯টার দিকে বিডিআরের বার্ষিক দরবার চলাকালে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহীরা সদর দপ্তরের বিভিন্ন প্রবেশপথ দখল করে নেয় এবং চারপাশে গুলি ছুড়তে থাকে। সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো হয়, তাদের পরিবারকে জিম্মি করা হয়। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ধরে চলে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।

এই ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ জন বিডিআর সদস্য এবং পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পরে পিলখানা এলাকায় গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় বহু মরদেহ। পুরো জাতি সেই সময় গভীর শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

মামলা, বিচার ও ঐতিহাসিক রায়

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ৮৫০ জন এবং বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ আদালত হত্যা মামলার রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। পরে হাইকোর্ট আপিলের রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, কিছু আসামির সাজা কমানো ও খালাস দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্যদিকে, বিস্ফোরক আইনের মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমানে মামলাটিতে এক হাজারের বেশি সাক্ষীর মধ্যে কয়েক শতাধিক সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দিতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসায় মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ও নতুন বিতর্ক

রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাক্ষীদের বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম উঠে এসেছে। আইন অনুযায়ী তাদের আসামি করা সম্ভব - এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় ও বিতর্কিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে।

বিডিআর থেকে বিজিবি: বিদ্রোহের পর পুনর্গঠন

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বিডিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। সরকার বাহিনী পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
পোশাক, লোগো, আইন ও কাঠামোগত পরিবর্তন এনে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়।

সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য: সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত

জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতা ছিল।
তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অতীতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

বিচার প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

পিলখানা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারিক মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। বিস্ফোরক আইনের মামলায় নতুন করে রাজনৈতিক নেতাদের আসামি করা হলে মামলার পরিসর ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। একদিকে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়, অন্যদিকে এই মামলার রাজনৈতিক মাত্রা দেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
 


সম্পর্কিত নিউজ