{{ news.section.title }}
পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস আজ, বিডিআর নামেই কি ফিরছে বিজিবি?
নির্বাচনের ঠিক চার দিন আগে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, জনগণের রায় নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআরের নাম ও ইউনিফর্ম পুনর্বহাল করা হবে। এর পাশাপাশি পিলখানায় সেনা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ অথবা ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ অথবা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তিনি।
এই বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে - যেখানে “মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত” নাম ফেরানোর প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
সরকার গঠনের পর ‘বিডিআর’ নাম পরিবর্তনের অগ্রগতি কোথায়
নির্বাচনের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এই পরিকল্পনা কত দূর এগিয়েছে? জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অনুবিভাগের যুগ্মসচিব রেবেকা খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইতিমধ্যে নাম পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ফাইল প্রসেস করার কাজ এখনো শুরু হয়নি। বিজিবি থেকে অথবা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে চাহিদা এলেই ফাইল প্রসেস করার কাজ শুরু হবে। কেবল তো সরকার হলো, শিগিগরই হয় সেই প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যাবে।’
অর্থাৎ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (ফাইল প্রসেস) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি; সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে “চাহিদা” গেলেই নথিভিত্তিক কাজ এগোবে - এটাই মূল বক্তব্য।
আজ পিলখানার ১৭ বছর: ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’
রাজধানীর পিলখানায় তত্কালীন বিডিআর সদর দপ্তরে সেনা অফিসারদের নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞের ১৭ বছর আজ। শোকাবহ পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস। অন্তর্বর্তী সরকার এই দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার তথ্য দেশীয় গণমাধ্যমেও এসেছে।
নতুন তদন্ত প্রসঙ্গ: সরকার কী বলছে
পিলখানার ভেতরে সেনা অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কি ছিল ষড়যন্ত্র? কেন এতগুলো অফিসারকে জীবন দিতে হলো? অন্তর্বর্তী সরকার এজন্য গঠন করেছিল ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’। কমিশনের রিপোর্টে তত্কালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই রিপোর্টে আস্থা রাখতে পারছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একদিন আগেই গত সোমবার বলেছেন, পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নতুন করে তদন্ত করবে সরকার।
তবে একই ইস্যুতে পরবর্তী সংবাদে দেখা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন কমিশন গঠন নয় অন্তর্বর্তী সরকারের কমিশনের সুপারিশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আগের বক্তব্য “সংশোধন” করেছেন এমন তথ্যও এসেছে।
‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর বাণী ও কর্মসূচি
‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শহীদ সেনা সদস্যদের শোকসন্তুপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং সেনা হত্যাযজ্ঞে শহীদদের মাগফেরত কামনা করেন। দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশন কী বলেছিল
আন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ ১১ মাস ধরে তদন্ত করে সরকারের কাছে রিপোর্ট দাখিল করে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েক জন আওয়ামী লীগ নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে আসে রিপোর্টে।
পিলখানায় তত্কালীন বিডিআর সদর দপ্তরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দলগতভাবে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা পেয়েছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। তারা বলছে, এ ঘটনার মূল সমন্বয়কারী ছিলেন তত্কালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। এ ছাড়া এই ঘটনায় ভারতেরও সম্পৃক্ততা পেয়েছে কমিশন। কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরও জড়িত ছিলেন।
সেনাপ্রধান কী বলেছিলেন: ‘ইফ’ ‘বাট’ নয়
কী বলেছিলেন সেনাপ্রধান?: যদিও গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন, ‘একটা জিনিস সব সময় মনে রাখতে হবে, এই বর্বরতা কোনো সেনাসদস্য করেনি। সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য দ্বারা সংঘটিত। ফুলস্টপ। এখানে কোনো ‘ইফ’, ‘বাট’ (যদি, কিন্তু) নাই। এখানে যদি ‘ইফ’ এবং ‘বাট’ আনেন, এই যে বিচারিক কার্যক্রম এত দিন ধরে হয়েছে, ১৬ বছর ধরে, ১৭ বছর ধরে যারা জেলে আছে, যারা কনভিকটেড, সেই বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এই জিনিসটা আমাদের খুব পরিষ্কার করে মনে রাখা প্রয়োজন। এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করবেন না। যে সমস্ত সদস্য শাস্তি পেয়েছে, তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।’
মইন ইউ আহমেদের বক্তব্য: ‘সহযোগিতা কম ছিল’ তবে ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে নীরব
ঘটনার সময় সেনা প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইউটিউবে এক সাক্ষাত্কারে তিনি ঐ দিনের ঘটনার অনেক কিছুই জানিয়েছেন। তার দাবি, তদন্তে সরকার তেমন সহায়তা করেনি। তবে পেছনের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে বিপথগামী সদস্যরা কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে তান্ডব চালায়। ঐ দুই দিনে যে ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে তার মধ্যে আছেন বিডিআরের তত্কালীন মহাপরিচালকসহ ৫৭ জন সেনা অফিসার এবং নারী ও শিশুসহ আরো ১৭ জন।
এই প্রাণহানির সংখ্যা বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিক্যাপেও উল্লেখ আছে।
সেদিন কী ঘটেছিল: মামলার নথিতে যে বিবরণ
সেদিন কী ঘটেছিল: হাইকোর্টে জমা হওয়া মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল তত্কালীন বিডিআরের বার্ষিক দরবারের দিন। অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ৯টায় সদর দপ্তরের দরবার হলে। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ বারী, বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাসহ বিডিআরের নানা পদের সদস্যরা। সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, ঐ দিন দরবারে উপস্থিত ছিলেন ২ হাজার ৫৬০ জন।
দরবার শুরুর পর মহাপরিচালকের বক্তব্য চলাকালে সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে মঞ্চের বাঁ দিকের পেছন থেকে দুই জন বিদ্রোহী জওয়ান অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করেন, এক জন ছিলেন সশস্ত্র। শুরু হয় বিদ্রোহ। দরবার হলের বাইরে থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যে লাল-সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিদ্রোহী জওয়ানরা দরবার হল ঘিরে গুলি শুরু করেন।
সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্রোহীরা কর্মকর্তাদের দরবার হল থেকে সারিবদ্ধভাবে বের করে আনেন। ডিজির নেতৃত্বে কর্মকর্তারা দরবার হলের বাইরে পা রাখা মাত্র মুখে কাপড় ও মাথায় হলুদ রঙের হেলমেট পরা চার জন ডিজিকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করেন। ডিজির পর হত্যা করা হয় আরো কয়েক জন কর্মকর্তাকে। এরপর পিলখানার ভেতরে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে।
সন্ধ্যায় পিলখানার বিদ্যুত্-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের লাশ মাটিতে পুঁতে ও সরিয়ে ফেলা হয়। পরদিন অর্থাত্ ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ শুরু করে।
স্মরণ + নীতি সিদ্ধান্ত + তদন্ত
আজকের দিনে পিলখানা ট্র্যাজেডি স্মরণ হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সামনে এসেছে বিডিআরের নাম ও ইউনিফর্ম প্রসঙ্গ যেটি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি ছিল এবং এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায় “নীতিগত সিদ্ধান্ত” পর্যায়ে আছে।
আর তদন্ত প্রশ্নে সরকার একদিকে “নতুন করে তদন্ত” বলছে, অন্যদিকে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এই দুই ধরনের বক্তব্য সংবাদে এসেছে ফলে সামনে কীভাবে অগ্রসর হবে, সেটাই এখন মূল নজরদারির বিষয়।
পিলখানা: স্মরণ পেরিয়ে কি নীতি ও বিচারের নতুন অধ্যায়?
পিলখানার ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয় এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, বিচার-প্রক্রিয়া, এবং জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর ক্ষত। আজ ১৭ বছর পরও এই দিনের স্মরণে আবেগ যেমন তীব্র, তেমনি তীব্র “সত্য–দায়–জবাবদিহি” নিয়ে প্রশ্ন।
বিডিআরের নাম ও ইউনিফর্ম পুনর্বহালের নীতিগত সিদ্ধান্ত, শহীদ সেনা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা, আর তদন্ত নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, পিলখানাকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় অবস্থান এখন আর কেবল স্মরণে সীমাবদ্ধ নেই; নীতি ও বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও এটি নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ফাইল প্রসেসের অগ্রগতি, তদন্তের কাঠামো, এবং বাস্তবায়নের টাইমলাইন এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে, পিলখানার স্মৃতি এবার কোন পথে এগোয়।