{{ news.section.title }}
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে গোয়েন্দা নেতৃত্বে কায়ছার রশীদের নতুন দায়িত্ব
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরী দায়িত্ব পেয়েছেন। সাম্প্রতিক সেনাবাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের রদবদলের অংশ হিসেবে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পদ হিসেবে বিবেচিত। নিয়োগের পর তিনি সংস্থাটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণও করেছেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (Armed Forces Division) এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নবনিযুক্ত ডিজিএফআই প্রধান কায়ছার রশীদ চৌধুরীকে মেজর জেনারেলের র্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় নিয়োগের পর তিনি সংস্থাটির প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলে চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস), প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) ও ডিজিএফআই প্রধান পদেও নতুন মুখ এসেছে।
ডিজিএফআই কী ধরনের সংস্থা, কেন এই পদটি গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিএফআই মূলত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা যার কাজ জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় কৌশলগত সহায়তা দেওয়া। সংস্থাটির বাজেট ও অনেক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিবদ্ধ/গোপনীয় থাকে। ডিজিএফআইয়ের প্রধান পদে যিনি থাকেন, তার ওপর দেশীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি, কৌশলগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রতিরক্ষা–গোয়েন্দা সমন্বয়ের বড় দায়িত্ব থাকে।
মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ: প্রশিক্ষণে ‘শীর্ষস্থান’-যা বলা হচ্ছে
মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো তাঁর প্রশিক্ষণ রেকর্ড। ডেইলি সানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ২৯তম বিএমএ লং কোর্সে দ্বিতীয় সেরা ক্যাডেট হিসেবে কমিশন লাভ করেন এবং বর্তমানে তিনি নিজের কোর্সের সিনিয়র-মোস্ট কর্মকর্তা। একই প্রতিবেদনে সহকর্মীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত তথ্য এসেছে। সেখানে বলা হয় বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য থেকে তিনি দুইবার স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন; পাশাপাশি তুরস্ক থেকে আর্টিলারি বেসিক কোর্স এবং পাকিস্তান থেকে গানারি স্টাফ কোর্স শেষ করেছেন।
এই ধরনের বিদেশি ও দেশীয় কোর্সগুলো সাধারণত একজন কর্মকর্তার কৌশলগত চিন্তা, অপারেশনাল পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখে বিশেষ করে যখন দায়িত্ব যায় এমন একটি সংস্থায়, যেখানে মাঠ-অপারেশন, বিশ্লেষণ, এবং জাতীয় নিরাপত্তার বহুস্তরীয় বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করে।
প্রশিক্ষক–প্রশাসক–অপারেশনাল দায়িত্ব: কোথায় কোথায় কাজ করেছেন
বাংলাদেশ প্রতিদিন জানিয়েছে, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্টিলারি ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর (বিএম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনি ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (ডিএসসিএসসি)-তে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিরেক্টিং স্টাফ এবং চিফ ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি স্কুল অব আর্টিলারিতেও তিন মেয়াদে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের নিয়োগ সাধারণত সেনাবাহিনীর ভেতরে “স্ট্র্যাটেজিক থিংকিং” ও প্রশিক্ষণ–ডকট্রিন উন্নয়নের অংশ হিসেবে ধরা হয়। প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ মানে শুধু শেখানো নয়; বরং পরিকল্পনা, মূল্যায়ন, সিদ্ধান্ত-প্রণয়ন, এবং নেতৃত্বগত সক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধার দেওয়ার একটি দায়িত্ব।
জাতিসংঘ সদর দপ্তর (UNHQ): শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার দাবি
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে (UNHQ) যোগ দেন এবং সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের “শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ” হিসেবে অবস্থান সুসংহত রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য ডেপ্লয়মেন্ট বা নতুন সুযোগ তৈরিতেও তিনি অবদান রাখেন।
এখানে শান্তিরক্ষা প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট যোগ হয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দপ্তরের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ; ১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ইউনিফর্মধারী সদস্য পাঠিয়ে আসছে।
এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (AFD) ওয়েবসাইটে বিভিন্ন বছরের অবস্থানভিত্তিক তথ্যও প্রকাশ করা হয় যেখানে বাংলাদেশ একাধিক বছর শীর্ষ অবদানকারীদের তালিকায় উপরের দিকে ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে (কোন বছর কোন অবস্থানে ছিল এভাবে বছরভিত্তিক তালিকা দেওয়া থাকে)।
জাতিসংঘের “Troop and police contributors” পেজে সদস্যপ্রদানকারী দেশগুলোর তালিকা ও নিয়মিত আপডেটেড ডেটা থাকে শান্তিরক্ষা অবদান যাচাইয়ের জন্য এটিকে প্রাথমিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
নিয়োগের ঘোষণা ও ‘শীর্ষ রদবদল’: কী ইঙ্গিত দেয়
এই নিয়োগকে অনেক পর্যবেক্ষক দেখছেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের রদবদলের অংশ হিসেবে-যেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্টাফ/অপারেশনাল অবস্থানগুলোতে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এক প্রতিবেদনে যেমন বলা হয়েছে, নতুন সিজিএস ও নতুন পিএসও নিয়োগের পাশাপাশি ডিজিএফআইয়ের ডিজি পদেও পরিবর্তন এসেছে।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে অনুষ্ঠানিকতার দিকটিও সামনে এসেছে-প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে র্যাঙ্ক ব্যাজ পরানো এবং দায়িত্ব গ্রহণ। এটি সাধারণত একটি “ফরমাল ট্রানজিশন”-যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের বার্তা দেওয়া হয়।
‘যোগ্যতা’ নিয়ে যেসব মন্তব্য আসছে-কীভাবে দেখা উচিত
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে সহকর্মীদের কিছু প্রশংসামূলক মন্তব্যও আছে-যেখানে তাকে “মেধাবী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, চৌকস” ইত্যাদি বলা হয়েছে এবং ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থায় তার নিয়োগকে “সময়োপযোগী” হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ডেইলি সানের প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণ সাফল্য ও বিদেশি কোর্সের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি সামরিক প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছেন-এটি একটি “প্রফেশনাল ট্র্যাক-রেকর্ড” হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এ ধরনের প্রতিবেদনগুলো সাধারণত “সামরিক সূত্র” বা “সহকর্মী-উদ্ধৃতি”ভিত্তিক হয়। পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো-যেসব তথ্য নথিভিত্তিক (কোর্স, পোস্টিং, দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ, অনুষ্ঠান) সেগুলোকে আলাদা করে দেখা; আর মূল্যায়নধর্মী অংশকে “সূত্রের ভাষ্য” হিসেবে বিবেচনা করা।
ডিজিএফআই ও জাতীয় নিরাপত্তা: বর্তমান বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জগুলো কী
ডিজিএফআইয়ের মতো প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সামনে সাধারণত কয়েকটি বড় ধরনের কাজ থাকে-
- সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন
- সন্ত্রাসবাদ/চরমপন্থা সংক্রান্ত গোয়েন্দা সমন্বয় (বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটি বহু বছর ধরে জাতীয় আলোচনায়)
- সাইবার ও তথ্যঝুঁকি-যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বাড়ছে
- শান্তিরক্ষা মিশন, আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, এবং কূটনৈতিক নিরাপত্তা মাত্রা
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ডিজিএফআইয়ের একটি কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট (CTIB) গঠনের কথা উল্লেখ রয়েছে এবং সংস্থাটিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলা হয়।
এগুলো সাধারণ প্রেক্ষাপট-তবে নির্দিষ্ট কোনো নীতি বা অপারেশনাল সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ডিজিএফআই স্বভাবতই প্রকাশ্যে মন্তব্য করে না। ফলে নতুন ডিজির দায়িত্ব গ্রহণের পর সাধারণত নজর থাকে-সংস্থার অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, কৌশলগত অগ্রাধিকার, এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে কাজের গতিপ্রকৃতির দিকে।
দায়িত্ব গ্রহণের সময়সূচি ও ‘ইনকাম্বেন্সি’: কী জানা যাচ্ছে
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠান হয় এবং তিনি নিয়োগের পর দায়িত্ব নেন।
অন্যদিকে “Director General of Forces Intelligence” শিরোনামে উন্মুক্ত একটি তথ্যভাণ্ডারেও (উইকিপিডিয়া) তাকে বর্তমান ইনকাম্বেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সময়সীমা “ফেব্রুয়ারি ২০২৬” দেখানো আছে-যদিও এ ধরনের উন্মুক্ত উৎসের তথ্য সবসময় আলাদা করে যাচাই করে নেওয়া ভালো, তবে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের সঙ্গে তারিখগুলো মোটামুটি মিলে যাচ্ছে।
সামনে নজর থাকবে কোথায়
নতুন মহাপরিচালক হিসেবে মেজর জেনারেল কায়ছার রশীদ চৌধুরীর সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে-সংস্থার গোয়েন্দা সক্ষমতা, বিশ্লেষণ কাঠামো, এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় আরও শক্ত করা; পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত অবস্থানকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা।
সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রশিক্ষণ–ডকট্রিন–ইনস্ট্রাকশনভিত্তিক দায়িত্ব এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা-এই দুই ধরনের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে থাকলে সাধারণত একজন কর্মকর্তা “স্ট্র্যাটেজিক” ও “অপারেশনাল”-দুই ধরনের কাজই এক ফ্রেমে দেখতে পারেন-এমনটাই মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটি অংশ।