ঢাকায় এক রাতে ঝরে গেল ৫ প্রাণ

ঢাকায় এক রাতে ঝরে গেল ৫ প্রাণ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

রাজধানী ঢাকার একটি রাত যেন একসঙ্গে বহু পরিবারের আনন্দ কেড়ে নিয়ে শোক নামিয়ে এনেছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) রাতে পৃথক তিনটি ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা সড়ক দুর্ঘটনা-একটি নিউমার্কেট এলাকায়, আরেকটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে। একই রাতে তেজগাঁওয়ের সোনারগাঁও হোটেল ক্রসিং এলাকায় পথকিশোরদের ঝগড়া থেকে সংঘটিত হয় হত্যাকাণ্ড।

প্রতিটি ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থাকলেও মিল একটাই-কিছু মুহূর্তের অসতর্কতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা বা উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত জীবন কেড়ে নিয়েছে।

১) ঈদের কেনাকাটায় বের হয়ে আর ফেরা হলো না: নিউমার্কেটে ট্রাকের ধাক্কায় বাবা-মেয়ের মৃত্যু

নিউমার্কেট থানাধীন সাইন্স ল্যাবরেটরি সড়কে শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে বাবা ও মেয়ের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন সাজু আক্তার সুমন (৪৭) এবং তার মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (২০)।
পুলিশ ও পরিবারসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাজু আক্তার সুমন মোটরসাইকেলে করে মেয়েকে নিয়ে সাইন্স ল্যাব এলাকার ওই সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে একটি ট্রাক ধাক্কা দিলে তারা রাস্তায় পড়ে যান এবং পরে ট্রাকটি তাদের চাপা দেয়। পুলিশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবার জানিয়েছে, নিহতরা দক্ষিণ শাহজাহানপুর এলাকায় বসবাস করতেন। সুমাইয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে পড়তেন এবং তার বাবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। আরও জানা গেছে, বাবা-মেয়ে নিউমার্কেট এলাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের লোকজন ট্রাকটি আটক করে চালককে পুলিশের হাতে তুলে দেন। নিউমার্কেট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহমুদুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

২) তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজি অটোরিকশার ধাক্কা: চালক-যাত্রী নিহত, দুই নারী আহত

একই রাতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আইল্যান্ডে ধাক্কা দিলে দুজন মারা যান। নিহতরা হলেন যাত্রী হারুনুর রহমান সানি (৩২) ও চালক আলিম (৫০)। দুর্ঘটনায় আহত হন অটোরিকশায় থাকা হারুনুরের স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার (২৬) এবং তার বোন হ্যাপি (২১)।

ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তেজগাঁও এলাকার পাশের সড়কে ইউলুপে। আহত অবস্থায় চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক সানি ও আলিমকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে নিহত সানির মামাশ্বশুর নাঈম হাসান জানান, তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার দশকাহনিয়া গ্রামে; বর্তমানে তারা মহাখালী এলাকায় থাকেন। সানি বনানীর একটি এজেন্সিতে চাকরি করতেন। তিনি বলেন, তারা বাসায় ফেরার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মো. মাহমুদুর রহমান ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন।

৩) সোনারগাঁও ক্রসিংয়ে পথকিশোরের মৃত্যু: “ড্যান্ডি খাওয়া” নিয়ে ঝগড়া, কাঁচের টুকরায় আঘাত

একই রাতের আরেক মর্মান্তিক ঘটনায় তেজগাঁওয়ের সোনারগাঁও হোটেল ক্রসিংয়ের সামনে পথকিশোরদের মারামারি থেকে একজন নিহত হন। নিহত কিশোরের নাম ময়জুল ওরফে কালু (১৬)।
তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা আলআমিন নামে আরেক কিশোর জানায়, তারা কারওয়ান বাজার এলাকায় থাকে এবং ভাঙারি টোকানোর কাজ করে। রাতে ক্রসিং এলাকায় “ড্যান্ডি খাওয়া” (মাদক সেবন) নিয়ে হামিদুল নামে আরেক কিশোরের সঙ্গে ময়জুলের ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে হামিদুল তার কাছে থাকা কাঁচের টুকরা দিয়ে ময়জুলের মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর পড়ে গেলে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে ঘটনাস্থলের লোকজন অভিযুক্ত হামিদুলকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। আলআমিন আরও জানায়, ময়জুলের বাড়ি ময়মনসিংহে; সে কারওয়ান বাজার এলাকায় থেকেই ভাঙারি টোকাত। তেজগাঁও থানার ওসি ক্যাশৈন্যু মারমা জানান, অভিযুক্ত কিশোরকে আটক করা হয়েছে এবং নিহতের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ করা হচ্ছে।

পথকিশোরদের বাস্তবতা: “ঠিকানা নেই-পথই ঘর”

এই ঘটনার পর আশপাশের অনেকে বলেছেন, পথকিশোরদের বড় অংশের স্থায়ী ঠিকানা থাকে না-পথেই থাকে, পথেই ঘুমায়। ফলে এমন কোনো কিশোর নিহত হলে তার পরিচয় নিশ্চিত করা, পরিবারকে খুঁজে বের করা, কিংবা সামাজিক সহায়তা পৌঁছানো-সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্রয়, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও নজরদারি না থাকলে পথশিশু-কিশোররা সহজেই মাদক ও সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

কেন এই ঘটনা

এক রাতের এই তিনটি ঘটনা ঢাকার দুটি বড় সমস্যাকে আবারও সামনে এনেছে। প্রথমত, সড়কে নিরাপত্তাহীনতা ও ভারী যানবাহনের ঝুঁকি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে রাতের সময় ইউটার্ন, আইল্যান্ড বা সংকীর্ণ সড়কে যখন গতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন দুর্ঘটনা সহজেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, পথকিশোরদের সুরক্ষা এবং মাদক ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। কারণ সামান্য উত্তেজনা বা নেশাজাতীয় সংঘাত খুব দ্রুতই গুরুতর সহিংসতা এমনকি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনাগুলো ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে-ট্রাকচালক আটক, সিএনজি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা, এবং কিশোর অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য রাতটি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে ফেরার অযোগ্য এক দুঃস্বপ্ন-যেখানে ঈদের প্রস্তুতি, বাড়ি ফেরা আর পথের জীবন-সব একসঙ্গে থেমে গেছে পাঁচটি প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে।


সম্পর্কিত নিউজ