তারেক রহমানের বিমানে ত্রুটি, হতে পারতো বড় বিপদ, কি বলছে তদন্ত!

তারেক রহমানের বিমানে ত্রুটি, হতে পারতো বড় বিপদ, কি বলছে তদন্ত!
ছবির ক্যাপশান, বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার | ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার বহরে থাকা একটি নির্দিষ্ট উড়োজাহাজকে ঘিরে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম এবং নথিপত্রের ঘাটতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সংস্থাটির এক অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিকবার একই ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরও তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা হয়নি, বরং ত্রুটি নির্ণয় ও কার্যকারিতা পরীক্ষার (ফাংশনাল/অপারেশনাল চেক) পর্যাপ্ত রেকর্ড তদন্ত কমিটির কাছে পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো-প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরুতর যান্ত্রিক ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই উড়োজাহাজ দিয়েই গত ২৫ ডিসেম্বর একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়, যেখানে তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানকে বহন করা হয়েছিল। বিমান পরিচালনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান বজায় রাখার দাবি থাকলেও, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত পর্যবেক্ষণগুলো বিমানটির সেফটি ম্যানেজমেন্ট, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং তদারকি কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

তদন্ত ও কমিটি গঠন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপপ্রধান প্রকৌশলী মো. মনসুরুল আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন ব্যবস্থাপক (অর্থ/ফাইন্যান্স) আবদুল্লাহ আল মামুন, এবং সদস্য ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশিক্ষণ–এয়ারক্রাফট/অ্যারো) মো. জুবিয়ারুল ইসলাম।

সাধারণত এ ধরনের তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য থাকে-

  • ত্রুটির ধরন ও পুনরাবৃত্তির কারণ শনাক্ত করা
  • রক্ষণাবেক্ষণের ধাপগুলো (কাজের সময়, পদ্ধতি, অনুমোদন, নথিভুক্তি) যাচাই করা
  • কোথায় দায়িত্বে অবহেলা বা প্রক্রিয়াগত ব্যত্যয় হয়েছে, তা নির্ধারণ করা
  • ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে করণীয় সুপারিশ করা

রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড না থাকায় প্রশ্ন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে গত বছরের ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর একাধিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ১০ ডিসেম্বরের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মাত্র আড়াই ঘণ্টায় শেষ করা হয়, যা তদন্ত কমিটির দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক কম সময়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ-ত্রুটি নির্ণয়/টেস্টিং সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য রেকর্ড পাওয়া যায়নি। বিমান রক্ষণাবেক্ষণে “কাজ হয়েছে” বলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো-কাজটি কীভাবে হয়েছে, কোন ধাপে হয়েছে, কোন স্ট্যান্ডার্ড/চেকলিস্ট অনুসরণ করা হয়েছে এবং কার অনুমোদনে উড্ডয়নের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে-এসবের লিখিত ও ট্রেসযোগ্য নথি। কারণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নথিভুক্তি (documentation) দুর্বল হলে পরে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, দায় নির্ধারণ এবং একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো-সবই কঠিন হয়ে পড়ে।

একই ত্রুটি বারবার

তদন্তে বলা হয়েছে, ১৫ দিনের ব্যবধানে একই যান্ত্রিক ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা হয়নি। প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইট মাঝ আকাশে থাকাকালে আবারও উড়োজাহাজটির একটি সিস্টেম বিকল হয় (প্রতিবেদনে এটি ভিএফএসজি হিসেবে উল্লেখ আছে)।

কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে-এ ধরনের ত্রুটি অবহেলা করলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড অথবা গিয়ারবক্সের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, ঘটনাটি কেবল “টেকনিক্যাল গ্লিচ” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই-তদন্ত কমিটি এটিকে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করেছে।

ত্রুটিপূর্ণ উড়োজাহাজে ভিভিআইপি ফ্লাইট

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৌশল বিভাগের এই উদাসীনতা বা প্রক্রিয়াগত ব্যত্যয়ের পরেও ত্রুটিপূর্ণ উড়োজাহাজটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়েছে। ভিভিআইপি ফ্লাইটে সাধারণত-

  • বিকল্প উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখা
  • অতিরিক্ত সেফটি মার্জিন বজায় রাখা
  • রক্ষণাবেক্ষণ ও অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ “ডাবল-চেক” করা -এ ধরনের বাড়তি সতর্কতা প্রত্যাশিত।

কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হলে ভিভিআইপি ফ্লাইট অনুমোদনের ক্ষেত্রে কারা কীভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছিলেন-সে প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

২৬ কোটি টাকার ক্ষতি, যন্ত্রাংশ বদল ও জরুরি ব্যয়

রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের এই অব্যবস্থাপনার ফলে প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই ক্ষতির পেছনে ছিল-

  • বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন
  • এক উড়োজাহাজ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্যটিতে বসানো
  • জরুরি ভিত্তিতে যন্ত্রাংশ পরিবহন
  • দ্রুত সমাধানের নামে পুনঃপুন ব্যয় বৃদ্ধি

এ ধরনের ব্যয় শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়-এটি পরিকল্পনার ঘাটতি, ইনভেন্টরি/স্পেয়ার-পার্টস ম্যানেজমেন্ট দুর্বলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলে-যা কমিটি “প্রশাসনিক ব্যর্থতা” হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।

সুপারিশ কার বিরুদ্ধে

প্রতিবেদনে দুই প্রকৌশলী-হীরালাল এবং মো. সাইফুজ্জামান খান-এর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির দাবি অনুযায়ী, উড়োজাহাজে কম ফুয়েল প্রেসারের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই উড্ডয়নের ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে এটিকে জানমালের বড় ঝুঁকি তৈরির মতো ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন জমা হলেও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নেই

বিমানের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রতিবেদন জমার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না এলেও সাধারণত পরবর্তী ধাপে-

  • দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি
  • রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার রিভিউ
  • নথিপত্র সংরক্ষণ ও ছাড়পত্র প্রদানের নিয়ম কঠোর করা
  • সেফটি অডিট/কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স জোরদার করা -এসব পদক্ষেপের আলোচনা শুরু হয়।

সম্পর্কিত নিউজ