দেশে কোন তেল কতো দিনের মজুদ আছে দেখুন তালিকা

দেশে কোন তেল কতো দিনের মজুদ আছে দেখুন তালিকা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সমুদ্রপথে নিরাপত্তা-ঝুঁকি বাড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেল-গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ চেইনে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো বাড়তি চাপ অনুভব করছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশের ভেতরে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের তাৎক্ষণিক সংকট নেই-বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি মজুত প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন। তবে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটলে সামনের দিনগুলোতে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালী: ঝুঁকির কেন্দ্র

বিশ্ব তেল সরবরাহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) বলছে-২০২৩ সালে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরল ভোগের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। একই সঙ্গে বিশ্ব এলএনজি বাণিজ্যেরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। অর্থাৎ এখানে সামান্য অচলাবস্থা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি ও বীমা-ভাড়া (freight/insurance) খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগটা দ্বিমুখী-(১) অপরিশোধিত তেল/কাঁচামাল আনা, (২) এলএনজি সরবরাহ ও ডেলিভারি শিডিউল ঠিক রাখা। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শিপিং রুট বদলাতে পারে, জাহাজের ভাড়া বাড়তে পারে, বন্দরে পৌঁছাতে সময় বাড়তে পারে-ফলে আমদানির মোট ব্যয় বেড়ে যায়। এগুলো শেষ পর্যন্ত দেশের পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, শিল্প উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্যদামের ওপর চাপ তৈরি করে।

বাংলাদেশে তেলের মজুত ও কভার

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী-মজুতের হিসাবে ডিজেল ১১ দিনের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত, পেট্রল ১২ দিনের, আর অকটেন ২৫ দিনের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত।
এই সংখ্যাগুলো “তাৎক্ষণিক সংকট নেই”-এই বার্তাই দেয়। তবে বাস্তবে চাহিদা মৌসুমভেদে বদলায়। যেমন কৃষি সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়ে, ঈদ বা উৎসবের সময় পরিবহন জ্বালানির চাহিদা বাড়ে, শিল্প উৎপাদন বাড়লে নির্দিষ্ট পণ্যে চাপ তৈরি হয়। ফলে যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে “মজুত আছে” বললেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না-বরং নতুন করে ক্রয়চুক্তি, শিপমেন্ট বুকিং, সময়মতো ডেলিভারি-এই তিনটি বিষয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিপিসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে দাম/সরবরাহ পরিকল্পনা আগে থেকেই করা থাকায় তাৎক্ষণিক ধাক্কা তুলনামূলক কম লাগতে পারে, কিন্তু বিকল্প উৎস ও ক্রয় পরিকল্পনাই এখন বড় নজরদারির জায়গা।

আমদানিনির্ভরতা ও বাধার স্থান

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর-এই বাস্তবতাই মূল ঝুঁকি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি অংশ অপরিশোধিত তেল আসে হরমুজ রুট-সংযুক্ত দেশগুলো থেকে, আর পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি উৎস থেকে।
যুদ্ধ তীব্র হলে দু’ভাবে চাপ আসতে পারে-

সরাসরি রুট ঝুঁকি: হরমুজ বা আশপাশে জাহাজ চলাচল কমে গেলে ডেলিভারি অনিশ্চিত।

দাম-ধাক্কা (price shock): রুট ঠিক থাকলেও বৈশ্বিক মূল্য বাড়লে একই পরিমাণ তেল কিনতে বেশি ডলার লাগে-চলতি হিসাবে চাপ পড়ে, ভর্তুকি/সমন্বয় ইস্যু আসে।

এলএনজি ও এলপিজি, গ্যাস বাজারে ঝুঁকি

তেল বাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি গ্যাস বাজারও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। আরপিজিসিএল-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে; এর বড় অংশ কাতার থেকে আসে।
অন্যদিকে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা আনুমানিক ১৪ লাখ টন-এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি।
যুদ্ধের কারণে যদি জাহাজভাড়া, বীমা, ডেলিভারি টাইমলাইন বিঘ্নিত হয়, তাহলে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রান্নার গ্যাসের বাজার-সবখানেই তরঙ্গ তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও নীতি-প্রস্তুতি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতিবিশ্লেষকদের আলোচনা থেকে সাধারণভাবে যেসব করণীয় সামনে আসে-

উৎস বৈচিত্র্য: নির্দিষ্ট রুট বা অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমানো।

স্পট ও টার্ম কন্ট্রাক্টের ভারসাম্য: দাম বেশি হলেও জরুরি স্পট কার্গো নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা।

মজুত ব্যবস্থাপনা: ডিজেল বা অন্যান্য উচ্চচাহিদার পণ্যের জন্য ‘কভার ডে’ বাড়ানো।

চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি যোগাযোগ: সরকারি ও বেসরকারি বড় ভোক্তাদের মধ্যে দক্ষতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং বাজারে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা।

ঝুঁকি যোগাযোগ: বাজারে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা/সাপ্লাই-চেইনে অপ্রয়োজনীয় চাপ ঠেকাতে নিয়মিত স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ।

 

 

দেশে তেলের মজুদ (তারিখ: মার্চ ২০২৬ অনুযায়ী)

তেলের ধরনমজুদ থাকা দিন
ডিজেল~১৪ দিন
অকটেন~২৮ দিন
পেট্রোল~১৫ দিন
ফার্নেস অয়েল~৯৩ দিন
জেট ফুয়েল~৫৫ দিন

সম্পর্কিত নিউজ