কেনো ডিসি সরওয়ারের নামে মামলা করতে চায় আদালত?

কেনো ডিসি সরওয়ারের নামে মামলা করতে চায় আদালত?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সিলেটে তাজউদ্দিন নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্তে অসহযোগিতা এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলমের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চেয়েছে আদালত। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনিক মহল ও আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ আঞ্চলিক মহাসড়কে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তাজউদ্দিন নামে এক যুবক। পরবর্তীতে এই ঘটনায় তার স্ত্রী মোছা. রুলী বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে।

তদন্তের স্বার্থে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনার দিন দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নাম, কার নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছিল এবং অভিযানে কোন বাহিনীর সদস্যরা অংশ নিয়েছিলেন-এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন। পাশাপাশি ওই দিন দায়িত্বে থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সদস্যদের তালিকা চেয়ে বিজিবির কাছেও আলাদা করে চিঠি পাঠানো হয়।

পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিজিবি কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের তালিকা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সরবরাহ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। এতে মামলার তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে।

তদন্তে সহযোগিতা না পাওয়ায় বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে আদালত গত ৮ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জেলা প্রশাসককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। ওই নোটিশে বলা হয়, কেন আদালতের আদেশ অমান্য করা এবং বিচারিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না-সে বিষয়ে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য প্রথমে ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং পরে ১ মার্চ তারিখ ধার্য করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত জবাব দেওয়া হয়নি এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় তথ্যও সরবরাহ করা হয়নি। এতে আদালত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পর্যবেক্ষণ দেন।

১ মার্চ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুদীপ্ত তালুকদার তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল। আদালতের মতে, তদন্তে সহযোগিতা না করা এবং তথ্য গোপন রাখা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

আদালত আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের এই ধরনের আচরণ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধের মধ্যে পড়ে। এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ১৭৫, ১৭৯ এবং ২১৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫ ধারার আওতায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে আদালত মত দেন।

তবে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা করতে হলে সরকারের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হয়। এই কারণেই আদালত সরাসরি মামলা গ্রহণ না করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সরকারের অনুমতি গ্রহণ করে বিষয়টি আদালতকে জানাতে হবে।

আইনজীবীদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতের এ ধরনের নির্দেশ খুব বেশি দেখা যায় না। তাই বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা মনে করেন, তদন্ত কার্যক্রমে কোনো ধরনের অসহযোগিতা থাকলে তা বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলার অনেকগুলোই বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তের আওতায়ও এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তাজউদ্দিন হত্যা মামলার তদন্তে প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং আদালতের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সিলেটসহ সারাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশনা ভবিষ্যতে তদন্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এই মামলার অগ্রগতি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারের অনুমতির ওপর, যার ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


সম্পর্কিত নিউজ