{{ news.section.title }}
আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ যেমন গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসেছে, তেমনি এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। তাঁর জন্য বিষয়টা এত কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজনীতির অমোঘ নিয়মে দৃশ্যপট বদলায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকার ৩০০ ফিট রাস্তার সেই জনসমুদ্র, যেখানে ২০ লাখ মানুষের সামনে তারেক রহমান মাত্র ১৭ মিনিটের এক সংক্ষিপ্ত অথচ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখলেন, তা যেন এক নতুন বাংলাদেশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে অতীতের জরাজীর্ণ প্রতিহিংসার রাজনীতি কিংবা পারস্পরিক অনাস্থার দেয়াল ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এই প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং সময়ের দাবি। বক্তব্য শেষ করেই তিনি কোনো রাজকীয় সংবর্ধনায় না গিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এভারকেয়ার হাসপাতালে, সেখানে চিকিৎসাধীন গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়া। জনস্রোত মাড়িয়ে সেই হাসপাতালে যাওয়া এবং সেখান থেকে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফেরার পথে দুপাশের মানুষের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের এক পরম স্বীকৃতি।
স্মরণ করা প্রয়োজন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের চরম আগ্রাসনের মুখে যখন বিএনপি শত শত গুম, খুন এবং লাখ লাখ মামলার বেড়াজালে পিষ্ট, তখন সুদূর প্রবাসে থেকেই দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা এবং রাষ্ট্রের অকার্যকর কাঠামো মেরামতে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তাঁর একান্ত বৈঠকগুলো জাতির মনে নতুন প্রত্যাশার বীজ বুনেছিল। সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন আমরা দেখলাম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গঠিত হলো নতুন সরকার।
তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক বিশাল ত্যাগের মহিমা। প্রায় দুই দশক ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে খালেদা জিয়া কারাবরণ করেছেন, সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই কঠিন সময়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা রাজপথে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি পারিবারিক আঙিনায় শামীম এস্কান্দার, সেলিনা ইসলাম, সৈয়দা শর্মিলা রহমান এবং লন্ডনে অবস্থানরত ডা. জোবাইদা রহমান খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ছায়ার মতো। অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের নিরলস পরিশ্রমের কথাও জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।
কিন্তু নিয়তির লিখন খণ্ডানো যায় না। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে চিরবিদায় নিলেন খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তাতে ঢাকা শহর যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশেই শায়িত হলেন তিনি। জানাজার আগে নজরুল ইসলাম খান যখন খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত কর্মজীবন তুলে ধরছিলেন, তখন সবার চোখ ছিল তারেক রহমানের দিকে। তিনি মাত্র ৫৮ সেকেন্ড কথা বললেন। তাঁর অনেক কিছু বলার থাকতে পারত; বাবার শাহাদাত, মায়ের ওপর হওয়া অমানুষিক অবিচার, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ কিংবা কারান্তরালে বিনা চিকিৎসার কথা। কিন্তু মিতভাষী তারেক রহমান কোনো রাজনৈতিক অভিযোগ করলেন না। তিনি কথা বললেন একজন সাধারণ সন্তানের মতো। মায়ের ঋণের কথা বললেন। কোনো ভুল করে থাকলে ক্ষমা চাইলেন।
জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করা এখন নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ১৭ বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া মানুষ এখন চায় সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। প্রাপ্তির খাতা কতটুকু পূর্ণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শুরুটা যে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
মতামতঃ
শায়রুল কবির খান
সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল