{{ news.section.title }}
একাকীত্বের ফাঁদে পুরুষ: যেভাবে হারাচ্ছে স্বাভাবিক শক্তি ও জীবনের তেজ!
বয়স যখন ষাটের ঘরে পৌঁছায়, তখন শরীরের মতো মনও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে একাকিত্ব (Social Isolation) এখন এক বড়ো জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), মার্কিন জাতীয় বার্ধক্য গবেষণা সংস্থা (NIA) এবং নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ারসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রমাণ করছে একাকিত্ব কেবল মানসিক কষ্ট নয়, বরং শারীরিক অসুস্থতারও প্রধান কারণ হয়ে উঠছে [WHO, 2023; NIA, 2024; Shen et al., 2025, Nature Human Behaviour]।
একাকিত্ব বনাম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা-
বিষয়টি বোঝা জরুরি যে "একাকিত্ব" (Loneliness) ও "সামাজিক বিচ্ছিন্নতা" (Social Isolation) একই জিনিস নয়।
⇨ একাকিত্ব হলো মানসিক অনুভূতি-কেউ নিজেকে আলাদা বা অযত্নে ফেলে রাখা মনে করছে।
⇨ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হলো বাস্তব অবস্থা-যেখানে কারো যোগাযোগ, মেলামেশা বা সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক সীমিত হয়ে পড়ে।
কেন বয়স্ক পুরুষরা বেশি ঝুঁকিতে?
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষরা বয়সে প্রবীণ হলে একাকিত্বে বেশি ভোগেন [Kim et al., 2022]।
এর কয়েকটি বড়ো কারণ-
⇨ সামাজিক নেটওয়ার্ক সংকুচিত হওয়া – কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর অনেক পুরুষ ধীরে ধীরে বন্ধু ও সহকর্মী হারান।
⇨ স্ত্রী বা সঙ্গীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা – অনেক পুরুষের সামাজিক বন্ধন স্ত্রীকেন্দ্রিক হয়। সঙ্গীর মৃত্যু হলে তারা হঠাৎ একেবারে একা হয়ে যান।
⇨ পুরুষালী মানসিকতা – সমাজ পুরুষদের আবেগ প্রকাশ বা সাহায্য চাইতে নিরুৎসাহিত করে। ফলে তারা দুঃখ বা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে রাখেন।
ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শরীর ও মনের ওপর যে প্রভাব ফেলে, তা ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
যেমন-
⇨ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে – ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের ২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, একাকিত্ব হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি
উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় [Cambridge, 2025]।
⇨ ডিমেনশিয়া ও স্মৃতিভ্রংশ – দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব বৃদ্ধ বয়সে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ করতে পারে।
⇨ ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ – একাকিত্ব মানসিক চাপ তৈরি করে, যা বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়।
⇨ প্রোটিন স্তরের অস্বাভাবিকতা – যুক্তরাজ্যের UK Biobank-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাকিত্বে ভোগা মানুষের রক্তে অন্তত ১৭৫ ধরনের প্রোটিনের পরিবর্তন হয়, যেগুলো প্রদাহ, ইমিউন প্রতিক্রিয়া, হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও অকাল মৃত্যুর সাথে জড়িত [Shen et al., 2025]।
পরিসংখ্যান যা বলছে-
◑ যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫ বছরের ওপরে বসবাসকারী মানুষের প্রায় ২৪% সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আছেন [NCBI, 2020]।
◑ ইউরোপে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত পুরুষদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনে একজন নিয়মিতভাবে গভীর একাকিত্ব অনুভব করেন।
◑ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি চার জন প্রবীণ মানুষের একজন কোনো না কোনোভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছেন [WHO, 2023]।
প্রতিরোধ ও করণীয়:
একাকিত্বের সমস্যা ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক সমস্যা। সমাধানও তাই হতে হবে সমষ্টিগতভাবে—
⇨ পারিবারিক সংযোগ বজায় রাখা – পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া ও সময় দেওয়া জরুরি।
⇨ সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া – ক্লাব, মসজিদ-মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার বা স্বেচ্ছাসেবী কাজে প্রবীণদের সম্পৃক্ত করা।
⇨ ডিজিটাল সংযোগ – প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূরে থেকেও আত্মীয়-বন্ধুর সাথে কথা বলা একাকিত্ব কমাতে সহায়তা করে।
⇨ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা – পুরুষদের জন্য পরামর্শকেন্দ্র, গ্রুপ থেরাপি ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
একাকিত্বকে সাধারণ দুঃখ বা নিছক আবেগীয় সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেলে ভয়াবহ ভুল হবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্ট বলছে, এটি হৃদরোগ, মস্তিষ্কজনিত অসুখ, ডিপ্রেশন ও অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। তাই একে মোকাবিলা করতে পরিবার, সমাজ ও নীতি-নির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।