পেঁচার মাথা ২৭০ ডিগ্রি ঘোরা এবং অবিশ্বাস্য বন্য রহস্য উন্মোচিত!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
পেঁচা শুধু রহস্যময় ডাক কিংবা নিশাচর অভ্যাসের জন্যই নয়, বরং তার মাথা ঘোরানোর অসাধারণ ক্ষমতার জন্যও বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। আপনি কি জানেন, পেঁচা তার মাথা একদিকে প্রায় ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরাতে পারে, অথচ এর ফলে তাদের শরীর বা মস্তিষ্কে কোনো ক্ষতি হয় না? এই বিরল ক্ষমতার পেছনে লুকিয়ে আছে বিশেষ শারীরবৃত্তীয় গঠন, যা তাদের শিকারি জীবনে অমূল্য সহায়তা করে।
শারীরবৃত্তীয় রহস্য:
মানুষের ঘাড়ে যেখানে ৭টি অস্থিসন্ধি থাকে, সেখানে পেঁচাদের ঘাড়ে রয়েছে ১৪টি অস্থিসন্ধি-প্রায় দ্বিগুণ! এই বাড়তি নমনীয় অস্থিসন্ধি এবং নরম হাড়ের বিন্যাস মাথাকে এমনভাবে নড়াচড়া করতে দেয়, যা অন্য কোনো পাখি বা স্তন্যপায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়।
আবার, মাথা ঘোরানোর সময় মানুষের ক্ষেত্রে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু পেঁচাদের ঘাড়ের রক্তনালী এমনভাবে অভিযোজিত যে মাথা ঘোরানোর পরও মস্তিষ্কে রক্তের প্রবাহ বাধাহীনভাবে চলতে থাকে। তাদের ধমনীতে বিশেষ বায়ু-পকেট থাকে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং আকস্মিক ব্লকেজ এড়ায়।
বিবর্তনের সুবিধা:
পেঁচার চোখ মানুষের মতো সামনের দিকে অবস্থান করে। ফলে দৃষ্টিক্ষেত্র তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু মাথা ঘোরানোর এই ক্ষমতা তাদের চারপাশে প্রায় সম্পূর্ণ দৃশ্যপট তৈরি করে, যা অন্ধকারে শিকার ধরার সময় অপরিহার্য। নিজের শরীর না সরিয়ে কেবল মাথা ঘোরাতে পারার কারণে পেঁচা সহজেই শিকারকে নজরে রাখতে পারে। এতে শিকার তাদের উপস্থিতি টের পায় না। শব্দের উৎস কিংবা হালকা নড়াচড়াও তারা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
নিশাচর জীব হিসেবে পেঁচার এই অভিযোজন তাদের রাতের অন্ধকারে টিকে থাকার অন্যতম বড় অস্ত্র। তারা গাছের ডালে প্রায় স্থির থেকেও চারপাশের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
পেঁচার প্রজাতি ও বিস্তার:
স্ট্রিজিফর্মিস বর্গভুক্ত পেঁচার প্রায় ২০০টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশেই ১৭টি প্রজাতি দেখা যায়, যার মধ্যে বেশিরভাগই স্থায়ী, কিছু আবার পরিযায়ী। এরা প্রধানত ইঁদুর, কীটপতঙ্গ, এমনকি কিছু প্রজাতি মাছও শিকার করে। বাঁকানো ঠোঁট ও শক্তিশালী নখর তাদের শিকারের অস্ত্র। পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই পেঁচার বসবাস রয়েছে-শুধু কুমেরু, গ্রীনল্যান্ড এবং কয়েকটি নির্জন দ্বীপ ছাড়া।
বিবর্তন ও উৎপত্তি:
পেঁচা পৃথিবীতে এসেছে মানুষের আগমনের বহু আগেই। গবেষকরা অনুমান করেন প্রায় ৬ কোটি বছর আগে তাদের উদ্ভব হয়েছিল। জীবাশ্ম গবেষণা প্রমাণ করে, ডাইনোসর যুগের পরপরই পেঁচাদের আবির্ভাব ঘটে এবং সেই থেকে তারা পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে টিকে আছে।
প্রচলিত বিশ্বাস ও কুসংস্কার: অদ্ভুত ডাক আর নিশাচর স্বভাবের কারণে পেঁচা অনেক সংস্কৃতিতে কুসংস্কারের প্রতীক। আফ্রিকার কিকুয়ু উপজাতি মনে করে, পেঁচার ডাক মৃত্যুর আগমনী বার্তা। প্রাচীনকাল থেকেই পেঁচাকে মন্দ ভাগ্য, অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করে, পেঁচা আসলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে ইঁদুর ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে।
পেঁচার মাথা ২৭০ ডিগ্রি ঘোরানোর ক্ষমতা শুধু এক বিস্ময়কর শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য নয়, বরং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের এক অনন্য নিদর্শন। এই ক্ষমতা তাদের শিকারি হিসেবে অতুলনীয় করেছে এবং নিশাচর জীবনে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। মানুষ কুসংস্কার দিয়ে তাদের ভয় পেলেও বাস্তবে তারা প্রকৃতির এক দক্ষ রক্ষক, যে নিঃশব্দে রাত্রির অন্ধকারে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।