এক ভিডিও, তারপর আরেকটি-কেন আমরা অসীম চক্রে হারিয়ে যাই?এড়ানোর উপায় জানুন!

এক ভিডিও, তারপর আরেকটি-কেন আমরা অসীম চক্রে হারিয়ে যাই?এড়ানোর উপায় জানুন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

টিকটকের মতো শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর আকর্ষণ মুহূর্তেই মনকে মাতিয়ে তোলে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ধৈর্য এবং গভীর মনোযোগকে ক্ষয় করতে শুরু করছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, শুধু 'বিড়ম্বনায় স্বল্প সময়ের আনন্দ' নয়, বরং এটি আমাদের মানসিক ও শিক্ষাগত সক্ষমতার উপরেও প্রভাব ফেলছে।

স্বল্প-ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও মনোযোগ: আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকটক, রিলস, শর্টস ইত্যাদি এমন ভিডিও ফরম্যাট যা খুব দ্রুত বদলে যায়, আকর্ষণ দেওয়া হয় প্রচুর ভিজ্যুয়াল ও অডিও স্টিমুলাস দিয়ে। এই ধরণের স্বল্প, দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট মনকে "সংকেত-অনুসরণে" অভ্যস্ত করে তোলে। কিন্তু যখন মানুষ বেশি সময় ধরে কোনও কাজ করতে চায় যা মনোযোগ, ধৈর্য ও একটি ধারাবাহিক চিন্তা দাবি করে — যেমন বই পড়া, পড়াশোনা, গবেষণা — তখন এই স্বল্প অভ্যস্তি কাজ করে না । মন খুব দ্রুত বিকশিত হয়ে ওঠে "পরবর্তী আনন্দের ঝলকির প্রত্যাশায়"  যা গভীর মনোযোগ হ্রাস করে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বল্প-ভিডিও খুব বেশি ব্যবহার করে তারা "Prospective memory" অর্থাৎ আগেই নির্ধারিত কাজ, পরিকল্পনা ও স্মৃতিটুকু বজায় রাখার ক্ষেত্রে কম কার্যকরী হয়; কারণ কনটেন্ট-সুইচিং বা দ্রুত সামগ্রী পরিবর্তনের কারণে মন একগুঁয়ে কাজ রাখতে পারে না। এ ছাড়াও, Attention Network Test (ANT) ব্যবহার করে করা একটি EEG-ভিত্তিক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে যারা স্বল্প-ভিডিও অ্যাপগুলোর প্রতি আসক্তি বেশি তাদের "Executive control" (পরিচালন ক্ষমতা), মনোসংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং স্ব-নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বেশি। 

শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে, স্বল্প-ভিডিও অ্যাপ অ্যাডিকশন বাড়লে একদিকে "শিক্ষাগত উদ্বিগ্নতা" (academic anxiety) বাড়ে, অন্যদিকে শিক্ষার প্রতি মনোমুগ্ধতা ও সম্পৃক্ততা (engagement) কমে যায়।
 

নিউরোবায়োলজিক দৃষ্টিভঙ্গি: মস্তিষ্কে "ডোপামিন রিওয়ার্ড সার্কিট" (reward pathway) কাজ করে, যখন আমরা কিছু আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় ভিডিও দেখি, তখন ডোপামিন মুক্ত হয়, যা মনকে "আরেকটি ভিডিও" দেখার জন্য আকৃষ্ট করে। এই রিওয়ার্ড-সিস্টেম সৃষ্টি করে "ক্ষুধা-মতো" অনুভূতি যা দ্রুত উত্তেজনা বাড়ায়, কিন্তু স্থায়ী সন্তুষ্টি হ্রাস পায়। 

সময়ের সাথে সাথে, এই ধরনের পুনরাবৃত্তি উত্তেজনায় মস্তিষ্ক কিছুটা "সংবেদনশীলতা হ্রাস" করতে পারে। অর্থাৎ একই ধরণের উদ্দীপনায় আগের মতো আনন্দ অনুভব করতে কম সক্ষম হয়। 

জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব:কাজ করার সময়, পড়াশোনা বা সৃজনশীল কাজগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ প্রয়োজন। কিন্তু স্বল্প-ভিডিও অভ্যাস করলে মন খুব দ্রুত বিভ্রান্ত হয়। ফলে "অবিরাম মন্থর চিন্তা" করতে সময় পাওয়া যায় না, যা বিশ্লেষণ, ধৈর্য ধরে রাখার ক্ষমতা ও জটিল কাজ সম্পাদনের দক্ষতা কমিয়ে দেয়।

সামাজিক ও মানসিক দিক থেকেও প্রভাব পড়ে। সাধারণ কথোপকথন, বই-পড়া, প্রকৃতিতে হাঁটা– এসব ধীর গতির কাজগুলিতে মানুষ আগ্রহ হারাতে পারে, কারণ সবকিছু দ্রুত পরিবর্তনশীল  এবং উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছে।
 

প্রতিকার ও সুপারিশ:

⇨ স্ক্রিন টাইম সীমাবদ্ধ করা: দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা। বিশেষ করে রাতের বেলা এমন অ্যাপগুলোর ব্যবহার কমিয়ে আনা, কারণ রাতের শ্লাইড বা স্ক্রল ঘুম ও মনোযোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

⇨ মাইন্ডফুলনেস (সচেতন মনোসংযোগ) চর্চা: ধ্যান, মনোযোগ-ভিত্তিক ব্যায়াম, গভীর পড়াশোনা, ধীরে কিছু তৈরি করা প্রভৃতি কাজ যাতে মনকে "বহুল গতি-ধারণার" বাইরে নিয়ে আসে।
 

⇨ ডিভাইস-বিভাজন (Device Hygiene): 

◑ কাজের সময় ফোন/ট্যাব থেকে দূরে থাকা;

◑ প্রয়োজনীয়তাগুলোর জন্য ফোন খোলা;

◑ নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করা।

◑ বিভিন্ন ধরণের শিক্ষামূলক বা গঠনমূলক উপাদান নির্বাচন করা, অর্থাৎ কেবল বিনোদনের জন্য নয়, এমন ভিডিও, বই, কথোপকথন বা আলোচনায় সময় দেওয়া যা চিন্তা ও বিশ্লেষণ বাড়ায়।
 

⇨ পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সচেতনতা বাড়ানো, যুব সমাজকে শেখানো "ডিজিটাল মিনিমালিজম" বা "মনোযোগের কৌশল" যেন তারা নিজের সময় ও মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
 

টিকটকের তাড়াহুড়া আনন্দ একরকম "ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তি" দিছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ধৈর্য, মনোসংযোগ ও গভীর চিন্তার উপযোগী মস্তিষ্কের গঠন ও কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই পরিবর্তন রোধ করা যায় সচেতন ব্যবহার, সময় ও মননিবেশের চর্চা ও ডিজিটাল অভ্যাসের মধ্যে ভারসাম্য রাখার মাধ্যমে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ