মধুমক্ষির কেন নিজের ক্ষতি সত্ত্বেও আক্রমণ করে!

মধুমক্ষির কেন নিজের ক্ষতি সত্ত্বেও আক্রমণ করে!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মধুমক্ষি পৃথিবীর অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সামাজিক প্রাণী। তারা শুধু মধু উৎপাদনই করে না, বরং কৃষি ও পরিবেশের জন্য অপরিহার্য পরাগায়নের কাজও সম্পাদন করে। তবে তাদের জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ও বিস্ময়কর দিক হলো দংশন করার পরই অনেক সময় মধুমক্ষির মৃত্যু ঘটে। কেন এমন আত্মঘাতী আচরণ? এর পেছনে রয়েছে জটিল জৈবিক কারণ এবং বিবর্তনগত ব্যাখ্যা।

মধুমক্ষির হুল বা দংশন আসলে একটি পরিবর্তিত ডিম পাড়ার অঙ্গ (ovipositor)। এর মাথায় রয়েছে সূক্ষ্ম কাঁটা বা বার্ব, যা একবার নরম-ত্বকে ঢুকে গেলে সহজে বের হয় না। যখন মধুমক্ষি কাউকে দংশন করে, তখন হুল আটকে যায় ত্বকে এবং বেরিয়ে আসার সময় এর সঙ্গে ছিঁড়ে যায় মধুমক্ষির উদর, স্নায়ুতন্ত্র ও অন্ত্রের কিছু অংশ। এ কারণেই দংশনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মধুমক্ষির মৃত্যু ঘটে।

প্রাণিজগতে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে এমন আত্মঘাতী আচরণ বিরল। বিজ্ঞানীরা বলেন, এটি মূলত কলোনি রক্ষার কৌশল। মধুমক্ষি একটি অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী; তারা হাজার হাজার সদস্য নিয়ে মৌচাক তৈরি করে। একটি মৌচাকে ডিম পাড়া রানী মধুমক্ষি থাকে মাত্র একটি, বাকি কর্মী মৌমাছিরা তাকে এবং পুরো উপনিবেশকে রক্ষা করে। কোনো শত্রু (মানুষ বা প্রাণী) আক্রমণ করলে কর্মী মৌমাছিরা আত্মঘাতী দংশনের মাধ্যমে শত্রুকে প্রতিহত করে, যাতে মৌচাক ও রানী বেঁচে যায়। অর্থাৎ, একজন কর্মীর মৃত্যু হলেও গোটা উপনিবেশ টিকে যায়-এটাই বিবর্তনের দৃষ্টিতে তাদের সফলতা।
 

মধুমক্ষির হুল থেকে যে বিষ বের হয়, তাতে থাকে মেলিটিন নামক পেপটাইড। এটি শত্রুর শরীরে ব্যথা, লালচে ভাব ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, হুল ত্বকে আটকে থাকার পরও এর সাথে যুক্ত পেশি কিছু সময় সক্রিয় থাকে এবং বিষ ইনজেক্ট করতে থাকে। ফলে আক্রমণকারী প্রাণী বা মানুষ শুধু ব্যথাই পায় না, বরং ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়। একইসাথে হুল থেকে নির্গত কিছু রাসায়নিক সংকেত (alarm pheromones) অন্য মৌমাছিদের আক্রমণে উসকে দেয়, যা সমষ্টিগত প্রতিরক্ষাকে আরও জোরদার করে।

 

সব মৌমাছি কি আত্মঘাতী দংশন করে?

না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সব ধরনের মৌমাছি দংশনের পর মারা যায় না।

মধুমক্ষি (honeybee) বিশেষভাবে মানুষের মতো চামড়াযুক্ত স্তন্যপায়ীদের দংশনের পর মারা যায়, কারণ তাদের ত্বকে হুল আটকে যায়। কিন্তু অন্য অনেক প্রজাতির মৌমাছি যেমন ভীমরুল (wasp) বা ভিন্ন ধরনের বোলতা তাদের হুল বারবার ব্যবহার করতে পারে, কারণ তাদের হুলে কাঁটা থাকে না। অতএব, আত্মঘাতী দংশন আসলে মধুমক্ষির জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
 

মানুষ ও পরিবেশের জন্য শিক্ষণীয় দিক:

মধুমক্ষির এই আত্মঘাতী আচরণ আমাদের শেখায় "ব্যক্তির চেয়ে সমাজ বড়"-তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে মৌচাককে রক্ষা করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরাগায়নের মাধ্যমে মৌমাছির ভূমিকা অমূল্য, তাই এই ক্ষুদ্র প্রাণীর আত্মত্যাগ প্রকৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

মধুমক্ষির দংশনের পর মৃত্যু আসলে দুর্ঘটনা নয়, বরং বিবর্তনের এক আশ্চর্য কৌশল। একটি হুল হয়তো একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু তার মাধ্যমেই পুরো উপনিবেশ টিকে থাকে। ফলে আত্মঘাতী এই আচরণ প্রমাণ করে প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম প্রাণীও কীভাবে বড় সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ