{{ news.section.title }}
জানাজার নামাজের নিয়ত, নিয়ম, দোয়া ও ফজিলত
জানাজার নামাজ কোনো মুসলমান মারা গেলে তার মাগফিরাতের জন্য আদায় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজে কেফায়া ইবাদত। এ নামাজ দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয় এবং এতে কোনো রুকু বা সেজদা নেই।
জানাজার নামাজ ৪ তাকবিরের সাথে দাঁড়িয়ে আদায়যোগ্য একটি ফরজে কেফায়া নামাজ, যেখানে রুকু-সেজদা নেই, শুধু দোয়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির মাগফেরাত কামনা করা হয়। এটি জামাতের সাথে আদায় করতে হয়। প্রথম তাকবিরে সানা, দ্বিতীয় তাকবিরে দরুদ শরিফ, তৃতীয় তাকবিরে মৃতের জন্য দোয়া এবং চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফেরাতে হয়।
জানাজার নামাজের নিয়ত
জানাজার নামাজের নিয়ত মূলত মনের একটি সংকল্প। আপনি কার জানাজা পড়ছেন এবং কার পেছনে পড়ছেন—মনে মনে এই ইচ্ছা পোষণ করলেই নিয়ত হয়ে যায়। এটি মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে চাইলে নিচের নিয়মে করতে পারেন:
১. আরবিতে নিয়ত (যদি মুখস্থ থাকে)
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উয়াদ্দিয়া লিল্লািহ তাআলা আরবাআ তাকবিরাতি সালাতিল জানাজাতি, ফারজুল কিফায়াতি, আস-সানাউ লিল্লাহি তাআলা ওয়াছ-সালাতু আলান-নাবিয়্যি ওয়া আদ-দুআউ লিহাযাল মাইয়্যিতি (পুরুষ হলে) / লিহাযিহিল মাইয়্যিতাতি (নারী হলে), ইকদাদাইতু বিহা-যাল ইমাম, মুতাওয়াজজিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।
২. বাংলায় নিয়ত (সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি)
আপনি মনে মনে বা মুখে এভাবে বলতে পারেন:
"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে এই ইমামের পেছনে জানাজার ফরজে কেফায়া নামাজ ৪ তাকবিরের সাথে আদায় করছি। (মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে) এই মৃত ব্যক্তির মাগফিরাতের জন্য / (নারী হলে) এই মৃত মহিলার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করছি—আল্লাহু আকবার।"
কিছু জরুরি বিষয়:
নিয়ত কখন করবেন: ইমাম সাহেব যখন প্রথম তাকবির (আল্লাহু আকবার) দিয়ে হাত বাঁধবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার মনে এই সংকল্প থাকতে হবে।
ইমামের অনুসরণ: জানাজা যেহেতু জামাতে হয়, তাই 'ইমামের পেছনে পড়ছি' এই বিষয়টি নিয়তে থাকা জরুরি।
মৃত ব্যক্তি যদি শিশু হয়: তখন নিয়তে বলবেন, "এই নাবালক শিশুর জন্য দোয়া করছি।
জানাজার নামাজের নিয়ম (ধাপে ধাপে)
জানাজার নামাজ মোট ৪টি তাকবিরের মাধ্যমে আদায় করা হয়:
নিয়ত ও ১ম তাকবির: মনে মনে এই জানাজার নামাজের নিয়ত করে হাত বেঁধে 'আল্লাহু আকবার' বলে 'সানা' পড়তে হয়।
সানা: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা ছানাউকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
২য় তাকবির: পুনরায় হাত না তুলে 'আল্লাহু আকবার' বলে 'দরুদে ইব্রাহিম' পড়তে হয় (যা সাধারণ নামাজে আত্তাহিয়্যাতুর পর পড়া হয়)।
৩য় তাকবির: আবার 'আল্লাহু আকবার' বলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হয়। মৃত ব্যক্তি বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) না নাবালক, সেই অনুযায়ী দোয়া ভিন্ন হয়:
বালেগ পুরুষ বা নারীর দোয়া: "আল্লাহুম্মাগফির লি হাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়েবিনা ওয়া সগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া জাকারিনা ওয়া উনছানা..."।
নাবালক ছেলের দোয়া: "আল্লাহুম্মাজআলহু লানা ফারাতাও ওয়াজআলহু লানা আজরাও ওয়া জুখরাও ওয়াজআলহু লানা শাফিআও ওয়া মুশাফফাআ"।
৪র্থ তাকবির ও সমাপ্তি: সর্বশেষ 'আল্লাহু আকবার' বলে হাত ছেড়ে দিয়ে ডানে ও বামে সালাম ফেরানোর মাধ্যমে নামাজ শেষ করতে হয়।
জানাজার নামাজের দোয়া
জানাজার নামাজের মূল লক্ষ্য হলো মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা। তৃতীয় তাকবিরের পর যে বিশেষ দোয়াগুলো পড়া হয়, সেগুলোর অর্থ ও নাবালকদের জন্য নির্ধারিত দোয়া নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) নারী ও পুরুষের দোয়া ও অর্থ
প্রাপ্তবয়স্কদের জানাজায় এই দোয়াটি পড়া সুন্নত।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি হাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়েবিনা ওয়া সগিরিনা ওয়া কাবিরিনা ওয়া জাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম ওয়া মান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতওয়াফফাহু আলাল ইমান।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড় এবং পুরুষ ও নারী সবাইকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখেন, আর যাকে মৃত্যু দান করবেন তাকে ইমানের সঙ্গেই মৃত্যু দান করুন।"
২. নাবালক (শিশুদের) জন্য বিশেষ দোয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে তারা নিজেরা নিষ্পাপ হওয়ায় তাদের জন্য ক্ষমার বদলে তাদের উসিলায় মা-বাবার জন্য সওয়াব ও সুপারিশের দোয়া করা হয়।
নাবালক ছেলে শিশু হলে:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজআলহু লানা ফারতাও ওয়াঝআলহু লানা আজরাও ওয়া জুখরাও ওয়াঝআলহু লানা শাফিয়াও ওয়া মুশাফফাআ।
অর্থ: "হে আল্লাহ! এই শিশুটিকে আমাদের জন্য (পরকালের) অগ্রগামী ব্যবস্থাপক এবং আমাদের প্রতিদান ও সঞ্চয়ের মাধ্যম বানান। তাকে আমাদের জন্য এমন এক সুপারিশকারী বানান যার সুপারিশ আপনার দরবারে কবুল হয়।"
নাবালিকা মেয়ে শিশু হলে:
দোয়াটি প্রায় একই, শুধু স্ত্রীলিঙ্গ অনুযায়ী সামান্য পরিবর্তন হয়।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজআলহা লানা ফারতাও ওয়াঝআলহা লানা আজরাও ওয়া জুখরাও ওয়াঝআলহা লানা শাফিআতাও ওয়া মুশাফফাআহ।
অর্থ: "হে আল্লাহ! তাকে আমাদের অগ্রবর্তী ব্যবস্থাপক বানিয়ে দিন, তাকে আমাদের জন্য সঞ্চয় ও সওয়াবের উপকরণ বানিয়ে দিন এবং তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশকারী বানান।"
গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:
হাত তোলা: জানাজার নামাজে শুধু প্রথম তাকবিরের সময় হাত কান পর্যন্ত ওঠাতে হয়; বাকি তিনটি তাকবিরের সময় হাত ওঠানোর প্রয়োজন নেই。
দোয়া না জানলে: যদি কেউ উপরের নির্দিষ্ট দোয়াগুলো না জানেন, তবে "আল্লাহুম্মাগফির লিল মু'মিনিনা ওয়াল মু'মিনাত" (হে আল্লাহ! মুমিন নারী-পুরুষ সবাইকে ক্ষমা করুন) পড়লেও জানাজা হয়ে যাবে।
মৃত ভূমিষ্ঠ শিশু: যদি কোনো শিশু মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়, তবে তার জন্য জানাজার নামাজ পড়তে হয় না; শুধু গোসল দিয়ে দাফন করে দিলেই হয়।
জানাজার নামাজের ফজিলত
হাদিস অনুযায়ী জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করা এবং দাফন পর্যন্ত সাথে থাকার বিশেষ গুরুত্ব ও সওয়াব রয়েছে:
বিপুল সওয়াব: যে ব্যক্তি জানাজায় শরিক হবে, সে এক কিরাত পরিমাণ সওয়াব পাবে। আর যে দাফন শেষ করা পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে, সে দুই কিরাত পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে। এক কিরাত হচ্ছে ওহুদ পাহাড়ের সমান।
মৃতের জন্য সুপারিশ: যদি জানাজায় বেশি সংখ্যক মানুষ (বিশেষ করে ৪০ বা ১০০ জন ইমানদার) অংশ নেয়, তবে মৃত ব্যক্তির জন্য তাদের সুপারিশ বা দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
মুসলমানের অধিকার: এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের যে ছয়টি অধিকার রয়েছে, তার মধ্যে জানাজায় শরিক হওয়া এবং দাফন করা অন্যতম
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কেউ দোয়া না জানেন, তবে শুধু ইমামের অনুসরণ করে তাকবিরগুলো বললেও জানাজা আদায় হয়ে যাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জানাজার নামাজের জন্য পবিত্রতা (ওজু) অপরিহার্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই এটি প্রযোজ্য, তবে নারীরা সাধারণত এতে অংশ নেন না।