{{ news.section.title }}
তারাবী নামাজের বিধান দোয়া ও ফজিলত সমূহ
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
রমজান মাস এলেই তারাবীহ নামাজের এক আলাদা অনুভূতি তৈরি হয়। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার, তারপর এশার নামাজ, আর শেষে তারাবীহ - এই পুরো সময়টাই যেন হৃদয়কে শান্ত করে দেয়। মসজিদের কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, ইমামের তিলাওয়াত শোনা, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভুলগুলো স্মরণ করা - সব মিলিয়ে তারাবীহ শুধু একটি নামাজ নয়, বরং আত্মাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার একটি সুযোগ।
অনেকেই সারা বছর নামাজে অনিয়মিত থাকলেও রমজানে তারাবীহ পড়তে মসজিদে আসে। এই মাসটাই যেন আল্লাহর কাছে ফিরে আসার সবচেয়ে সুন্দর সময়। দীর্ঘ কিরাআত, সিজদা, আর দোয়ার মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজের অজান্তেই আল্লাহর কাছে আরও কাছাকাছি চলে যায়।
তারাবীহ আমাদের ধৈর্য শেখায়, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা বাড়ায়, আর অন্তরকে নরম করে। তাই চেষ্টা করা উচিত, রমজানজুড়ে নিয়মিত তারাবীহ পড়ার এবং এই সুন্দর অভ্যাসটাকে রমজানের পরেও ধরে রাখার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম (তারাবীহ) আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। তাই তারাবীহ শুধু একটি সুন্নাত নামাজ নয়, বরং গুনাহ মাফের এক বড় সুযোগ।
তারাবীহ নামাজ কী এবং এর গুরুত্ব
রমজান মাসের রাতে এশার নামাজের চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে দুই রাকাত করে ১০ সালামে যে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তারাবীহ নামাজ বলা হয়।
আরবি ‘তারাবীহ’ শব্দটির মূল ধাতু ‘রাহাতুন’, যার অর্থ আরাম বা বিশ্রাম। তারাবীহ নামাজ আদায়ের সময় প্রতি দুই রাকাত বা চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া হয়। দীর্ঘ কিয়াম ও কিরাআতের পর শরীরকে আরাম দেওয়ার জন্য এই বিরতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এজন্য এই নামাজকে ‘সালাতুত তারাবীহ’ বা তারাবীহ নামাজ বলা হয়।
রমজান মাসে তারাবীহ নামাজ জামাতে আদায় করা এবং পুরো কুরআন শরিফ একবার খতম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ নিয়মিতভাবে এই আমল করে গেছেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তারাবীহ নামাজ পড়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন -
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়ামুল লাইল (তারাবীহ) আদায় করবে, তার অতীতের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২২০৫)
তারাবীহ নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব
রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে তারাবীহ নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা আদায় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তারাবীহ নামাজ জামাতে আদায় করা এবং এতে কুরআন শরিফ খতম করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে কেউ যদি ঘরে বা মসজিদে সূরা কিরাআতের মাধ্যমে আদায় করে, তবুও সে সওয়াব লাভ করবে।
রমজানে তারাবীহ নামাজ আদায়কারীর জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমা ও রহমতের ঘোষণা রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন -
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে তারাবী নামাজ আদায় করে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।”
(সহিহ বুখারি: ২০৪৭)
আরও বলেছেন -
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রোজা রাখেন, তারাবী নামাজ পড়েন এবং কদরের রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদত করেন, তার জীবনের আগের সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।”
(মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৮৬২)
রমজানের এই বিশেষ রাতের নামাজে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। তারাবীহকে কেন্দ্র করে দেশের মসজিদগুলোতে উপচে পড়া মুসল্লির উপস্থিতি দেখা যায়।
সাধারণ মুসলমানদের সুবিধার্থে নিচে তারাবীহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও মোনাজাত তুলে ধরা হলো -
তারাবীহ নামাজ পড়ার নিয়ম
এশার চার রাকাত ফরজ নামাজ আদায়ের পর দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ পড়ে তারাবীহ নামাজ আদায় করা হয়। তারাবীহ নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করা হয় এবং প্রতি দুই রাকাত শেষে সালাম ফিরানো হয়। এভাবে মোট বিশ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। প্রতি চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয়। এই সময় তাসবিহ, তাহলিল, দরুদ শরিফ ও দোয়া পাঠ করা উত্তম। বিশ্রামের এই সময়টিকে তারবিহা বলা হয়, যার কারণে এই নামাজের নাম রাখা হয়েছে তারাবীহ।
তারাবীহ নামাজের নিয়ত
তারাবীহ নামাজ আদায়ের আগে নিয়ত করা সুন্নত। এই নিয়ত অন্তরে বাংলায় করলেও কোনো সমস্যা নেই। আমাদের দেশের প্রচলিত তারাবির আরবি নিয়তটি হলো-
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ للهِ تَعَالَى رَكْعَتَى صَلَوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবি সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তায়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
অর্থ : আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবি সুন্নত নামাজের নিয়ত করছি; আল্লাহু আকবার।
তারাবীহ নামাজের নিয়ত আরবিতে করা জরুরি নয়। নিজের ভাষায় অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, মনে মনে বলা যেতে পারে । বাংলাতে এভাবে নিয়ত করা যায় , ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারাবি -এর দুই রাকাত নামাজ কেবলামুখী হয়ে (জামাত হলে- এ ইমামের পেছনে) পড়ছি- (اَللهُ اَكْبَر) আল্লাহু আকবার।
তারাবীহ নামাজের দোয়া
তারাবীহ নামাজে প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া হয়। এ সময় একটি দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে আমাদের দেশে। প্রায় সব মসজিদের মুসল্লিরা এই দোয়াটি পড়ে থাকেন। দোয়াটি হলো-
سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظْمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِيْ لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوْتُ اَبَدًا اَبَدَ سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ المْلائِكَةِ وَالرُّوْحِ
উচ্চারণ : ‘সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইয্যাতি ওয়াল আঝমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল ঝাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।’
এ সময় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়া পড়া যেতে পারে। আলেমদের মতে, তারাবীহ নামাজে চার রাকাত পর বিশ্রামের সময় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া, তওবা ও ইসতেগফার পড়াই উত্তম।
তারাবীহ নামাজ কয় রাকাত
তারাবীহ নামাজ আট নয়, বরং বিশ রাকাত হিসেবেই প্রমাণিত। যদিও কেউ কেউ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ২০ রাকাত তারাবির হাদিসকে সূত্রের দিক থেকে দুর্বল বলে দাবি করেন; তবে বিশুদ্ধ সূত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বিশ রাকাত তারাবীহ শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
আমিরুল মুমিনীন হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকাল থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে আজ পর্যন্ত মক্কা শরিফের মসজিদুল হারাম, মদিনা শরিফের মসজিদে নববীসহ বিশ্বের অধিকাংশ মসজিদে বিশ রাকাত তারাবীহ নামাজ আদায় করা হয়ে আসছে। দীর্ঘ এই সময়ে কোথাও আট রাকাত তারাবীহ প্রচলন দেখা যায়নি।
সর্বপ্রথম ১২৮৪ সালে ভারতবর্ষের কিছু আহলে হাদিস আলেম আট রাকাত তারাবীহ ফতোয়া দিয়ে উম্মাহর ঐক্যমত্যপূর্ণ বিষয়ে বিভক্তি সৃষ্টি করেন। তখন অন্যান্য আহলে হাদিস আলেমরাও এর বিরোধিতা করেছিলেন। পরে আরব বিশ্বের কিছু বিচ্ছিন্ন আলেম এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন, তবে আরব বিশ্বের অধিকাংশ আলেম এখনও বিশ রাকাত তারাবীহ ওপর আমল করে আসছেন।
তারাবীহ নামাজের মোনাজাত
প্রতিদিন তারাবীহ নামাজ শেষে দেশের মসজিদগুলোতে একটি দোয়ার পড়ে মোনাজাতের প্রচলন রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই দেশব্যাপী মসজিদগুলোতে এই দোয়াটি হলো-
اَللَهُمَّ اِنَّا نَسْئَالُكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةَ وَالنَّارِ- بِرَحْمَتِكَ يَاعَزِيْزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيْمُ يَاجَبَّارُ يَاخَالِقُ يَابَارُّ اَللَّهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ- بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّحِمِيْنَ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনাননার। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নার। বিরাহমাতিকা ইয়া আঝিঝু ইয়া গাফফার, ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহিমু ইয়া ঝাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বার্রু। আল্লাহুম্মা আঝিরনা মিনান নার। ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।’
দোয়াটি পড়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তারাবীহ নামাজ শুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এই দোয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন তারাবীহ নামাজের প্রতি চার রাকাত পরপর যে দোয়া পড়া হয়, সেটিও তারাবি নামাজ বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়।
আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, তারাবীহ নামাজ সঠিকভাবে আদায় করতে হলে নামাজ শেষে অবশ্যই এই দোয়া পড়তে হবে। কিন্তু এমন ধারণা বা বিশ্বাস মোটেই সঠিক নয়।
মাহে রমজানের রাতে তারাবীহ নামাজ জামাতে আদায়ের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা প্রতিদিন মসজিদে সমবেত হন। দেশের প্রতিটি মসজিদে একই পদ্ধতিতে খতমে তারাবীহ আদায়ের সুবিধার্থে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ রোজার প্রথম ছয় দিন দেড় পারা করে এবং পরে লাইলাতুল কদর পর্যন্ত বাকি ২১ দিন এক পারা করে তিলাওয়াত করার পরামর্শ দিয়েছে। এতে করে মুসল্লিরা স্থান পরিবর্তন করলেও খতমে তারাবিতে কোরআন তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতা থেকে বঞ্চিত হন না।
মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল তারাবীহ নামাজ কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। আসুন, আমরা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তারাবি নামাজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।