তারাবির রাতে শিশুদের ইবাদতের শিক্ষা

তারাবির রাতে শিশুদের ইবাদতের শিক্ষা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জুম্মার দিনে শিশুদের মসজিদে নামাজে অংশ নিতে দেখা গেলেও সাধারণ দিনগুলোতে তাদের উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু রমজান মাস এলে চিত্রটা একেবারেই বদলে যায়। এই মাসজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই শিশুদের মসজিদে আসতে দেখা যায় বিশেষ করে এশার নামাজে। ইফতারের পর এশা ও তারাবি নামাজের সময় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ভিড় বাড়তে থাকে, আর সেই ভিড়ের মধ্যেই চোখে পড়ে শিশুদের সারি - বাবার হাত ধরে, মায়ের সাথে, কিংবা নিজেরাই উৎসাহ নিয়ে মসজিদে ছুটে আসে।

রমজানের রাতে মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি শুধু ধর্মীয় চর্চা নয়, এটি এক অনন্য সামাজিক দৃশ্য। কাতারের পাশে বাবার মতো নামাজ শেখার চেষ্টা করা ছোট্ট শিশুরা ভবিষ্যৎ মুসলিম সমাজের ভিত্তি। মসজিদের কাতারে বড়দের পাশে দাঁড়িয়ে শিশুরা যখন নামাজ আদায় করার চেষ্টা করে, তখন তা এক অনন্য দৃশ্য হয়ে ওঠে। কেউ ঠিকভাবে রুকু-সিজদা করতে পারে, কেউ আবার খেলাচ্ছলে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তাদের উপস্থিতি পুরো পরিবেশে এক ধরনের প্রশান্তি ও আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।

অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছোট বয়স থেকেই সন্তানদের মসজিদমুখী করা তাদের ঈমানি শিক্ষা ও ধর্মীয় চেতনা গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবির দীর্ঘ কিরাআত, দোয়া ও ইবাদতের পরিবেশ শিশুদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং নামাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। শৈশবেই যদি শিশুদের নামাজ ও মসজিদের পরিবেশে অভ্যস্ত করা যায়, তাহলে তারা বড় হয়ে সহজেই ইবাদতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এতে তাদের ধৈর্য, শালীনতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা হয়, তারা শেখে কীভাবে শান্তভাবে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে আল্লাহর সামনে বিনয়ী হতে হয়।

অনেক ইমাম ও আলেমরা বলেন - শিশুদের মসজিদে আনতে উৎসাহ দেওয়া উচিত, কিন্তু তাদের দ্বারা যেন অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়, সে বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের জোর করে নয়, ভালোবাসা দিয়ে তারাবিতে অভ্যস্ত করা। কখনো যদি তারা কোলাহল করে বা মনোযোগ না দিতে পারে, তখন ধৈর্য ধরে বোঝানো উচিত। কারণ তারাও শিখছে, বড় হচ্ছে।

শিশুদের জন্য মসজিদে সুন্দর ও সহনশীল পরিবেশ তৈরি করা হলে তারা আনন্দের সঙ্গে নামাজে অংশ নেয় এবং মসজিদকে ভয় নয়, ভালোবাসার জায়গা হিসেবে মনে করে। রমজানের এই পবিত্র রাতে শিশুদের কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত, নামাজের কাতারে তাদের নিষ্পাপ দাঁড়ানো - সব মিলিয়ে মসজিদ যেন প্রাণ ফিরে পায়। তারাবিতে শিশুদের অংশগ্রহণ কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং আগামী প্রজন্মের ঈমানি সমাজ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ বীজ রোপণ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ ও শিশুদের প্রতি দয়ার উদাহরণ

বুখারী শরীফে এসেছে - 
রাসুলুল্লাহ ﷺ তার নাতনী হযরত উমামা বিনতে যায়নাব (রা.)-কে কোলে বা কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি দাঁড়ালে তাকে উঠিয়ে নিতেন, আর সিজদায় গেলে নামিয়ে রাখতেন। (সুনান আবু দাউদ ৯২০)

আরেক হাদিসে এসেছে - 
রাসূলুল্লাহ ﷺ জোহর বা আসরের নামাজে হাসান বা হুসাইন (রা.)-কে নিয়ে নামাজে দাঁড়ান। সিজদার সময় শিশুটি তার পিঠে চড়ে বসলে তিনি সিজদা দীর্ঘ করেন, যেন শিশুটি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে।

আরেক হাদিসে এসেছে - 
রাসুল ﷺ খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় তার নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.) আসলে তিনি খুতবা থামিয়ে তাদের কোলে তুলে আদর করেন এবং বলেন, “আমি খুতবা শেষ করা পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারলাম না।” (নাসায়ী)

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন - 
“যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”
(আবু দাউদ, তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)

আজকের বাস্তবতা ও আমাদের দায়িত্ব

নামাজ পড়ার সময় যদি পেছনের সারি থেকে বাচ্চাদের হাসির আওয়াজ না আসে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাপারে ভয় করুন।

মুহাম্মদ ﷺ নিজে শিশুদের কোলে নিয়ে নামাজ পড়েছেন, অথচ আজ অনেক মুরব্বি মুসল্লি মসজিদে শিশুদের উপস্থিতি সহ্য করতে পারেন না - এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় এক সতর্কবার্তা।

তাই তরুণদের সতর্ক হওয়া দরকার, মুরব্বিদের এই বিষয়ে সুন্দরভাবে বোঝানো দরকার। আমাদের আলেম ও খতিবদের বয়ানে শিশুদের প্রতি সহনশীলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। তাহলে শিশুরা মসজিদমুখী হতে আগ্রহী হবে, আর মসজিদ হয়ে উঠবে ভালোবাসার কেন্দ্র।

উলামায়ে কেরামের মতামত

উলামায়ে কেরাম বলেন -

শিশুদের মসজিদে আনা জায়েজ ও সুন্নাহসম্মত।

তবে তাদের দ্বারা মুসল্লিদের যেন কষ্ট না হয়, সে বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

শিশুরা আজ মসজিদের কাতারে দাঁড়াচ্ছে - এটাই আগামী দিনের ঈমানি সমাজের সবচেয়ে বড় আশা। আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই তারাবি ও নামাজের আলোয় বড় করে তুলি।


সম্পর্কিত নিউজ