{{ news.section.title }}
রোজায় শরীরে শক্তি ধরে রাখতে যা করবেন
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রোজা। রোজা মানুষকে শারীরিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করে - এই শিক্ষা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা অনেক সময় উল্টো হয়। রমজান এলেই যেন ইবাদতের মাসটা ধীরে ধীরে “খাবারের আয়োজনের মাসে” বদলে যায়। ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল-মশলার ভারী পদ, মিষ্টি ও সোডা - সব মিলিয়ে রোজার মূল উদ্দেশ্যটাই অনেকের ক্ষেত্রে আড়ালে পড়ে যায়।
স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরে পানিশূন্যতা (dehydration) তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমরা অনেকেই ইফতারে এমন খাবার বেছে নিই, যা তৃষ্ণা আরও বাড়ায় - লবণাক্ত, গভীর ভাজা খাবার বা অতিরিক্ত মিষ্টি ফলে দিনের কষ্ট কমার বদলে শরীর আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনও বলেছে, পর্যাপ্ত পানি ও পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি এবং লবণাক্ত খাবার তৃষ্ণা বাড়ায় - তাই এগুলো কমানো ভালো।
লম্বা সময় রোজায় শরীর যেভাবে প্রভাবিত হয়
রমজানে অনেকের রোজা থাকে ১৫–১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। এই সময় শরীর “শক্তি বাঁচিয়ে চলার” মোডে যায় - যাকে সাধারণ ভাষায় বলা যায়, শরীর নিজেকে মানিয়ে নেয়। কিন্তু পানি কম খাওয়া, ঘুমের ছন্দ বদলে যাওয়া এবং ভুল খাবারের কারণে ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে। গবেষণাভিত্তিক একটি রিভিউতে উল্লেখ আছে - রমজানের সময় পানির গ্রহণ কমে যায়, এতে শরীর পানি ধরে রাখার চেষ্টা করে এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রমজানে সুস্থ থাকতে পানি বেশি পান করা, পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, এবং ইফতারে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা - এসব পরামর্শ দিয়েছে।
“কম খাওয়া” নয় - “সঠিক খাওয়া”ই মূল কৌশল
অনেকে মনে করেন, রোজায় শক্তি ধরে রাখতে হলে ইফতারে যতটা সম্ভব বেশি খেতে হবে। বাস্তবে অতিরিক্ত খাওয়া পেট ভারী করে, ঘুম নষ্ট করে, নামাজে মনোযোগ কমায় - আর পরদিন রোজা আরও কঠিন লাগে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত: সেহরি - ইফতার মিলিয়ে এমন খাবার, যা ধীরে শক্তি দেয়, তৃষ্ণা কমায়, হজম সহজ রাখে।
WHO এবং British Nutrition Foundation - দুই জায়গাতেই বারবার যে কথাটা এসেছে, তা হলো:
- পানি ও পানিসমৃদ্ধ খাবার (ফল, সবজি, দই, স্যুপ)
- লবণ ও অতিরিক্ত ভাজা খাবার কম
- সেহরিকে গুরুত্ব দেওয়া
সেহরিতে কী খাবেন: “ধীরে শক্তি দেয়” - এমন প্লেট
সেহরি হলো দিনের রোজার “ভিত”। এখানে জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ফল–সবজি থাকলে শক্তি টেকে বেশি সময়।
সেহরিতে ভালো পছন্দ হতে পারে -
- হোল গ্রেইন রুটি/ওটস/বাদামি চাল (ধীরে শক্তি দেয়)
- ডিম/ডাল/দই/বাদাম (পেট ভরা রাখে)
- কলা/খেজুর/ফল (সহজ শক্তি + পটাশিয়াম)
- পর্যাপ্ত পানি + পানিসমৃদ্ধ খাবার (দই/সুপ/ফল)
যা কমালে ভালো: অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত ঝাল, গভীর ভাজা খাবার - এগুলো তৃষ্ণা ও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
ইফতার: প্রথম ১০ মিনিটই অনেক কিছু ঠিক করে দেয়
ইফতারে অনেকেই একসঙ্গে অনেক কিছু খেয়ে ফেলেন। এতে ব্লাড সুগার ওঠানামা, অ্যাসিডিটি বা পেট ভারী হওয়ার সমস্যা বাড়ে।
WHO-র পরামর্শ অনুযায়ী, ইফতার শুরু করা যেতে পারে খেজুর ও পানি দিয়ে - তারপর একটু বিরতি, তারপর মূল খাবার।
ইফতারে ভালো পদ্ধতি -
- পানি + খেজুর
- হালকা খাবার/সুপ
- এরপর ব্যালান্সড মিল: ভাত/রুটি + সবজি + প্রোটিন (মাছ/মাংস/ডাল)
ক্লান্তি কমাতে “ছোট” কিছু অভ্যাস, বড় ফল
১) মৃদু ব্যায়াম
রোজার শুরুতে শরীর নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয়, ফলে প্রথম কয়েক দিন শক্তি কম মনে হতে পারে। তাই দিনে হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং বা সহজ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে ক্লান্তি কমে এবং শরীর সতেজ থাকে। এছাড়া World Health Organization (WHO) পরামর্শ দিয়েছে - তাপমাত্রা বেশি থাকলে ঠান্ডা জায়গায় অবস্থান করতে, যাতে পানিশূন্যতার ঝুঁকি না বাড়ে।
২) ঘুমের সময়সূচি
রমজানে ইবাদত, তারাবিহ, সেহরি - সব মিলিয়ে ঘুম কমে যায়। চেষ্টা করুন ঘুম ভেঙে ভেঙে হলেও মোট ঘুমটা পূরণ করতে (দিনে একটু পাওয়ার ন্যাপও কাজে দেয়)।
৩) পানিশূন্যতার লক্ষণ চিনুন
অতিরিক্ত মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, খুব শুকনো মুখ, গা দুর্বল লাগা - এগুলো হলে পানি গ্রহণের সময়টা ঠিক করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। (বিশেষ করে যারা অসুস্থ/দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন।)
রোজার শিক্ষা - পেটে নয়, অভ্যাসে
রমজান আসলে “কম খাও, বেশি খাও”–এর মাস নয়; এটা সংযমের মাস। পেট নিয়ন্ত্রণ যেমন জরুরি, তেমনি জিহ্বা, চোখ, রাগ - সবকিছুরই সংযম জরুরি। খাবারের বেলায়ও তাই - ইবাদতের মাসকে যদি আমরা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাস বানাই, তাহলে রোজার শারীরিক উপকার যেমন বাড়বে, তেমনি ইবাদতে মনোযোগও বাড়বে।
শেষ কথা একটাই - রমজানকে ভারী খাবারের উৎসব না বানিয়ে, সহজ–পরিচ্ছন্ন–সুষম খাবারের মাস বানাতে পারলেই রোজার “রুহ” আরও সুন্দরভাবে ধরা দেবে - শরীরও থাকবে হালকা, মনও থাকবে প্রশান্ত।