খেজুর দিয়ে ইফতার - সুন্নত, বরকত আর শরীরেরও স্বস্তি

খেজুর দিয়ে ইফতার - সুন্নত, বরকত আর শরীরেরও স্বস্তি
ছবির ক্যাপশান, খেজুর দিয়ে ইফতার - সুন্নত, বরকত আর শরীরেরও স্বস্তি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

রমজান এলেই আমাদের চারপাশে এক ধরনের ব্যস্ততা তৈরি হয় - তারাবিহ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি ইফতার-সেহরির আয়োজন। এই ব্যস্ততার ভেতরেই একটা জিনিস চোখে পড়ে: অনেক সময় আমরা রোজাকে “সংযমের প্রশিক্ষণ” হিসেবে না দেখে “খাবারের সময়সূচি বদলানো” হিসেবে ধরে নেই। দিনের বেলা না খেয়ে থাকার পর ইফতারে এমনভাবে খেয়ে বসি যে শরীর ভারী হয়, তৃষ্ণা বাড়ে, ঘুম এলোমেলো হয় - ফলে ইবাদতে মনও ঠিকমতো বসে না।

অথচ রোজা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। এর উদ্দেশ্য শুধু না খাওয়া নয় - আত্মসংযম, তাকওয়া, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। রমজান আমাদের শেখায় কীভাবে শরীরের চাহিদার ওপর মনকে বসাতে হয়, আর দিনের শেষে ইফতার আমাদের শেখায় কীভাবে নিয়মানুবর্তিতা বজায় রেখে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় ফেরা যায়। এই জায়গায় খেজুর যেন রমজানের এক চেনা প্রতীক - কারণ নবীজি (সা.)-এর সুন্নত অনুসারে ইফতার শুরু করার সহজ, মার্জিত ও অর্থবহ উপায় এটি।


ইফতার তাড়াতাড়ি করার সুন্নত ও কল্যাণ

ইফতার মানে শুধু “খাবার খাওয়া” নয় - রোজার সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী রোজা পূর্ণ করা। হাদিসে ইফতার বিলম্ব না করার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যতদিন দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো - এটি শুধু সময়ের ব্যাপার না; এটি একটি নীতির শিক্ষা। অর্থাৎ, আল্লাহর বিধান মানা, অহেতুক কৃত্রিমতা না করা, আর ইবাদতকে সহজ ও নিয়মমাফিক রাখা।


খেজুর দিয়ে ইফতার: সুন্নত কেন, এবং “বরকত” মানে কী?

খেজুর দিয়ে ইফতার করা বাধ্যতামূলক নয়। পানি বা যে কোনো হালাল খাবার দিয়েই ইফতার করা যায়। তবে খেজুর দিয়ে ইফতারকে সুন্নত হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কারণ নবীজি (সা.) এটি পছন্দ করতেন এবং সাহাবিদের উৎসাহিত করেছিলেন। তিরমিজিতে বর্ণিত একটি হাদিসে আসে - ইফতার খেজুর দিয়ে করা উত্তম; না পেলে পানি দিয়ে করা যায়।

আর “বরকত” মানে শুধু ধর্মীয় দিক থেকে সওয়াব নয় - বরকতের একটি বাস্তব দিকও আছে: খেজুর সহজে হজম হয়, দ্রুত শক্তি দেয়, এবং ইফতারের প্রথম মুহূর্তে শরীরকে ধীরে করে স্বাভাবিক খাবারের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।


দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীর আসলে কী চায়?

রমজানে অনেকেরই ১৫–১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে হয়। এই দীর্ঘ বিরতির পর শরীর সাধারণত তিনটা জিনিস “চায়”:

  • দ্রুত কিছু শক্তি (সহজ শর্করা)
  • পানি/হাইড্রেশন
  • পেটের ওপর চাপ না পড়ে - এমন নরম শুরু

WHO রমজানে সুস্থ থাকতে কয়েকটি মৌলিক পরামর্শ দেয় - পর্যাপ্ত পানি পান করা, পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, এবং ইফতারে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার কথাও তারা উল্লেখ করে।

এটা ধর্মীয় সুন্নতের সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যপরামর্শের একটা সুন্দর মিলও তৈরি করে - কারণ ইফতার যদি খুব ভারী খাবার দিয়ে শুরু হয়, শরীর ধাক্কা খায়; কিন্তু খেজুর+পানি দিয়ে শুরু করলে শরীর “ধীরে জাগে”।


খেজুরের “পুষ্টিগত শক্তি” - কেন একে আদর্শ বলা হয়

খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি থাকে - যা দ্রুত শক্তি দিতে পারে। একই সঙ্গে এতে কিছু পরিমাণ ফাইবারও থাকে, যা হজমকে সহায়তা করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। বাস্তবে ইফতারে প্রথমে ১–৩টি খেজুর ও পানি খেলে অনেকেরই পেটের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে আসে - তারপর মাগরিবের নামাজ, তারপর ধীরে করে খাবার—এই ছন্দটা শরীরের জন্যও স্বস্তিদায়ক হয়।

১) তৃষ্ণা ও পানিশূন্যতা - খেজুর কীভাবে সহায়তা করতে পারে

খেজুর শুকনো ফল হলেও এতে পটাশিয়ামসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ থাকে। WHO-এর নির্দেশনায় রমজানে পর্যাপ্ত পানি এবং পানিসমৃদ্ধ খাবারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ পানিশূন্যতা রোজায় ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা বাড়াতে পারে।
খেজুর পানি নয় - তাই এটি পানির বিকল্প না। কিন্তু পানি খাওয়ার সাথে খেজুর যোগ হলে শরীর দ্রুত শক্তি পায় এবং ইফতার “সফট ল্যান্ডিং” হয়—অনেকের ক্ষেত্রে মাথা ঝিমঝিম করা বা গ্লুকোজ লো হওয়ার অনুভূতিও কমে।

২) হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য - ফাইবার এখানে বড় কথা

রমজানে পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য - এসব অভিযোগ খুব সাধারণ। কারণ খাবারের সময় কমে যায়, পানি কমে যায়, আর ভাজাপোড়া বাড়ে। খেজুর ফাইবারের একটি উৎস।
NHS বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ফাইবার গ্রহণ ৩০ গ্রাম পর্যন্ত নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে - কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তার কম খায়।
রমজানে যদি আমরা ফল, শাকসবজি, ডাল, ভুসিযুক্ত শস্যের পরিমাণ না বাড়াই - তাহলে হজমের সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক। খেজুর একা সব ঠিক করবে না, তবে “ফাইবার বাড়ানোর ছোট একটা পথ” হতে পারে।

৩) অতিরিক্ত খাওয়া কমাতে খেজুর কীভাবে সাহায্য করে

এটা খুব বাস্তব: দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার পর আমরা দ্রুত প্লেট ভরে ফেলি। কিন্তু খেজুর+পানি দিয়ে শুরু করে যদি ৫–১০ মিনিট বিরতি দিই (মাগরিব/হালকা বিরতি), শরীর সংকেত পায় - “খাবার এসেছে”, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝোঁক অনেক সময় কমে যায়। WHO-ও খাবার ভাগ করে খাওয়ার কথা বলে - ইফতার, হালকা রাতের খাবার, সেহরি - এভাবে ভাগ করলে শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে।


খেজুর পছন্দ না হলে কী করবেন - সুন্নতের উদ্দেশ্যটা ধরুন

অনেকে খেজুর পছন্দ করেন না - কারও কাছে বেশি মিষ্টি লাগে, কারও কাছে টেক্সচার ভালো লাগে না। এখানে মনে রাখা দরকার:

  • খেজুর দিয়ে ইফতার সুন্নত, বাধ্যতামূলক নয়।
  • খেজুর না খেলে রোজা “কম” হয়ে যায় - এমন নয়।
  • আপনি চাইলে পানি দিয়েই ইফতার করতে পারেন (হাদিসেও পানি উল্লেখ আছে)।

তবু যদি আপনি খেজুরের উপকারিতা নিতে চান, কয়েকটা সহজ উপায় আছে : 

১) খেজুর-দুধ/দই স্মুদি (ইফতারের প্রথম পানীয় হিসেবে)

১–২টি খেজুর (বীজ ছাড়িয়ে)

দুধ বা দই

সামান্য বাদাম/ওটস (ইচ্ছা হলে) এটা খুব ভারী না করে ছোট পরিমাণে নিলে ইফতার শুরুটা নরম হয়।

২) শরবতে খেজুর পেস্ট

খেজুর ভিজিয়ে পেস্ট করে সামান্য পানির সাথে মিশিয়ে নেওয়া যায় - চিনি বাড়ানোর দরকার পড়ে না, স্বাদও নরম লাগে।

৩) খেজুরের ধরন বদলান

খেজুর অনেক ধরনের হয় - কিছু নরম, কিছু শুকনো, কিছু কম মিষ্টি। বাজারে যে ধরনের খেজুর সহজে পাওয়া যায়, তার বাইরে অন্য ধরনও ট্রাই করা যায় (মাঝে মাঝে স্বাদ বদলালেই সমস্যা মিটে যায়)।

ইফতার-সেহরিতে যেসব ভুল রোজার “রুহ” নষ্ট করে দেয়

এগুলো খুব পরিচিত ভুল - কিন্তু রোজার অভ্যাসে বড় প্রভাব ফেলে:

১) ইফতারে ভাজাপোড়া দিয়ে শুরু করা

লবণাক্ত/গভীর ভাজা খাবার তৃষ্ণা বাড়ায়, এসিডিটি বাড়ায়, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। WHO ভারসাম্যপূর্ণ খাবার ও পানি পানে জোর দিয়েছে।

২) “সারাদিন না খেয়ে ছিলাম” - এই যুক্তিতে অতিরিক্ত খাওয়া

অতিরিক্ত খেলে ইবাদতে মন বসে না। তারাবিহ ভারী লাগে। পরদিন সেহরিতে খেতে ইচ্ছে করে না - ফলে দিনের রোজা আরও কঠিন হয়।

৩) সেহরি বাদ দেওয়া বা খুব কম খাওয়া

সেহরি বরকতের খাবার - এটা শুধু ধর্মীয় দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, আবার শারীরিকভাবে দিনের জ্বালানি। (আর আপনি যদি পানিশূন্যতা এড়াতে চান, সেহরিতে পানির পরিকল্পনা সবচেয়ে কাজে লাগে।)

সেহরি ও ইফতারের “সিম্পল প্লেট” - যাতে শক্তি থাকে, তৃষ্ণা কমে

এটা কোনো ফ্যান্সি ডায়েট না - একটা ব্যবহারিক গাইড:

সেহরি (দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখার জন্য)

  • ভুসিযুক্ত রুটি/ওটস/বাদামি চাল
  • ডিম/ডাল/দই
  • কলা/শসা/ফল
  • পর্যাপ্ত পানি

ইফতার (শরীরকে ধীরে স্বাভাবিক করার জন্য)

  • পানি + ১–৩টি খেজুর
  • ৫–১০ মিনিট বিরতি (মাগরিব/হালকা হাঁটা)
  • তারপর: ভাত/রুটি + সবজি + প্রোটিন
  • সাথে: পানিসমৃদ্ধ খাবার (ফল/স্যুপ)

WHO-এর পরামর্শেও খাবার ভাগ করে খাওয়ার কথা এসেছে - ইফতার, হালকা রাতের খাবার, সেহরি।

রোজা - শরীরের পাশাপাশি মনও “ট্রেনিং” পায়

রমজান শুধু “মেন্যু পরিবর্তনের” মাস নয়। এটা আত্মসংযমের মাস। খেজুর দিয়ে ইফতার করার সৌন্দর্যটা এখানেই - এটা আমাদের শেখায় “কম দিয়ে শুরু করতে”, “ধীরে খেতে”, “নিয়ম মানতে”, “অতিরিক্তে না যেতে” - এগুলো সবই রোজার মূল শিক্ষার অংশ।

যদি আমরা এই মাসে খাবারকে সহজ করি, অপ্রয়োজনীয় ভোজ কমাই, পানির দিকে খেয়াল রাখি - তাহলে ক্লান্তি কমে, ঘুম ঠিক থাকে, ইবাদতেও মন বসে। আর ইফতারের শুরুতে খেজুর+পানি - এই ছোট্ট সুন্নতটা অনেকের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ