{{ news.section.title }}
বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষ নিয়ে মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের গবেষণাপত্র
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক এবং তরুণ পেশাজীবীদের (যাদের মধ্যে হিজাব, দাড়ি, ধর্মীয় টুপি, পাঞ্জাবি–পায়জামা ইত্যাদি দৃশ্যমান ইসলামী চিহ্ন রয়েছে বা ইসলামি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত) নিয়ে করা একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৯৭.১ শতাংশ জানিয়েছেন-তারা ইসলামোফোবিয়ার ঘটনা নিজে ভোগ করেছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন। একই জরিপে ৫৫.৭ শতাংশ বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে তারা সরাসরি ইসলামোফোবিয়ার শিকার হয়েছেন।
গবেষণাটি “Islamophobia in Bangladesh: A cross sectional study” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে; লেখক হিসেবে আছেন মোহাম্মদ সোরোয়ার হোসেন, ফারহিন ইসলাম ও এসএম ইয়াসির আরাফাত।
কীভাবে গবেষণা হয়েছে
গবেষকরা বাংলাদেশে বসবাসরত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক এবং তরুণ পেশাজীবীদের অনলাইন জরিপ করেন-যাদের মধ্যে দৃশ্যমান ইসলামী চর্চার চিহ্ন রয়েছে (হিজাব, দাড়ি, ধর্মীয় টুপি, পাঞ্জাবি–পায়জামা) বা যারা ইসলামি কার্যক্রমসংক্রান্ত কাজে যুক্ত।
২১ প্রশ্নের প্রশ্নপত্রটি জনস্বাস্থ্য গবেষক, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন পরিসংখ্যানবিদসহ বহুমাত্রিক বিশেষজ্ঞ দল তৈরি করেন; ভুক্তভোগীদের সঙ্গে পরামর্শও নেওয়া হয়। প্রশ্নপত্রটি ২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর পাইলট করে সংশোধনের পর চূড়ান্ত করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের সুবিধার জন্য বাংলা ভাষায় পরিচালিত হয়।
তথ্য সংগ্রহ করা হয় অনলাইনে-ইসলামি প্রোগ্রাম-সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে অংশগ্রহণকারী নেওয়া হয় এবং গবেষণার উদ্দেশ্য, ইসলামোফোবিয়ার সংজ্ঞা, গোপনীয়তা ও ফর্ম পূরণের নির্দেশনা জানিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট শেয়ার করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা গুগল ফর্মে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর ২০২৪ সময়ের মধ্যে স্ব-উদ্যোগে উত্তর দেন।
গবেষণাটি Biomedical Research Foundation, Bangladesh-এর Ethical Review Board থেকে নৈতিক অনুমোদন পেয়েছে (Memo no: BRF/ERB/2024/04); অংশগ্রহণ স্বেচ্ছাসেবী ছিল এবং গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
ডেটা পরিষ্কার ও বিশ্লেষণে Stata S/E version 14 ব্যবহার করা হয়; বর্ণনামূলক পরিসংখ্যানের পাশাপাশি chi-square টেস্ট এবং ভুক্তভোগী হওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান শনাক্তে মাল্টিভেরিয়েট লজিস্টিক রিগ্রেশন করা হয়।
কারা অংশ নিয়েছেন
জরিপে মোট ১,৬৫৫ জন অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৯.৩ শতাংশের বয়স ২১–২৫ বছর, এবং ৬৫.৯ শতাংশ পুরুষ। অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী (৬৫.১ শতাংশ), এরপর সদ্য স্নাতক (১৫.৬ শতাংশ) ও তরুণ পেশাজীবী (১৯.৩ শতাংশ)।
শিক্ষা/কর্মক্ষেত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (৪২.৮ শতাংশ), এরপর আর্টস ও সোশ্যাল সায়েন্স (১৯.১ শতাংশ), ব্যবসা ও অর্থনীতি (১৫.২ শতাংশ) এবং মেডিকেল সায়েন্স (১০.৯ শতাংশ)। অংশগ্রহণকারীদের ৭৭.২ শতাংশ ঢাকার বাইরে বসবাসকারী এবং দেশের সব ৬৪টি জেলা থেকে অংশগ্রহণ ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামোফোবিয়ার ধরন: পোশাকভিত্তিক বৈষম্য শীর্ষে
যারাইসলামোফোবিয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ বাঅভিজ্ঞ হয়েছেন (n=1,607), তাদের বর্ণনায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে-
- পোশাক/ড্রেসকোডের কারণে বৈষম্য: ৬৯.৯%
- মৌখিক হয়রানি: ৫৯.২%
- ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক বিদ্রূপ (cultural mockery): ৫১.৭%
ঘটনারঘনত্বের ক্ষেত্রে গবেষণায় বলা হয়েছে, বেশিরভাগঘটনা “অকেশনালি/কখনও কখনও” ঘটেবলে অংশগ্রহণকারীরা জানান (৪৪.০%)।
কারা বেশি অভিযুক্ত: শিক্ষকই প্রধান ‘পরপেট্রেটর’
গবেষণার ফল অনুযায়ী ইসলামোফোবিয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষকদের নাম এসেছে-৬৩.৪ শতাংশ। এরপর আত্মীয় (৩৯.৫%) এবং প্রতিবেশী (২৬.৯%)।
ভুক্তভোগীদের মানসিক, একাডেমিক ও সামাজিক প্রভাব
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে যারা সরাসরি ভুক্তভোগী (n=922), তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও একাডেমিক পারফরম্যান্সে প্রভাব “সামান্য থেকে অত্যন্ত” পর্যায়ের বিভিন্ন মাত্রায় রিপোর্ট করা হয়েছে; গবেষণার সারাংশে বলা হয়েছে ভুক্তভোগীদের বড় অংশ মানসিক স্বাস্থ্য ও একাডেমিক পারফরম্যান্সে প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন এবং ৭৬ শতাংশ শিক্ষাগত/পেশাগত কার্যক্রম এড়িয়ে চলেছেন।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে-
- ৭৬.০৩% ইসলামোফোবিয়ার কারণেশিক্ষাগত/পেশাগত/সামাজিক কার্যক্রম এড়িয়ে চলেছেন
- ২১.৩৭% ড্রেসকোড বাধর্মীয় চর্চা বদলানোর কথা বিবেচনা করেছেন
- রিপোর্টকৃতসমস্যার মধ্যে স্ট্রেস/অ্যাংজাইটি বৃদ্ধি ৬৫.৪০%, আইসোলেশনঅনুভূতি ৫৪.৭৭%, লোসেলফ-এস্টিম ৪৪.৫৮%
- ৩৫.৫৭% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন, ১২.৫৮% চাকরি ছাড়ারকথা বিবেচনা করেছেন, এবং ৩৬.০১% জব স্যাটিসফ্যাকশন কমে যাওয়ার কথাবলেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া: ‘কোনো পদক্ষেপ নেই’ বলছেন অর্ধেকের বেশি
অংশগ্রহণকারীদের ৪০.৭৯% বলেছেন-তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে ইসলামোফোবিয়া মাঝারি মাত্রায় বিদ্যমান; ২১.৪৫% বলেছেন “উল্লেখযোগ্যভাবে”, ৫.৮০% বলেছেন “অত্যন্ত”।
প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ৫৫.৪১% বলেছেন-ঘটনা ঘটলে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয় না। মাত্র ১.৯৯% একে “প্রোঅ্যাকটিভ ও কার্যকর” বলেছেন।
নীতিমালা সম্পর্কেও একই ধরনের চিত্র: মাত্র ৪.৪১% বলেছেন তাদের প্রতিষ্ঠান/কর্মস্থলে ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধে অফিসিয়াল নীতি আছে; ৪৩.৬৩% বলেছেন তারা জানেন না। যে ৭৩ জন নীতির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন, তাদের মধ্যে ৪২.৪৭% নীতিকে “সামান্য কার্যকর” বলেছেন।
কারা বেশি ভুক্তভোগী: বয়স, নারী হওয়া এবং কিছু শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্ক
লজিস্টিক রিগ্রেশনের ফল অনুযায়ী (মাল্টিভেরিয়েট মডেল), ভুক্তভোগী হওয়ার সঙ্গে বয়স, লিঙ্গ এবং অধ্যয়ন/কর্মক্ষেত্রের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত। ১৮–২০ বছর বয়সীদের তুলনায় ২১–২৫, ২৬–৩০ এবং ৩০-এর বেশি বয়সীরা যথাক্রমে ১.৬৬৮, ১.৯৭৯ এবং ১.৭৬২ গুণ বেশি ভুক্তভোগী হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে (AOR ও ৯৫% CI গবেষণায় দেওয়া আছে)।
নারীরা পুরুষের তুলনায় ২.৪২৯ গুণ বেশি ভুক্তভোগী হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে (AOR=2.429; 95% CI: 1.925–3.066)।
শিক্ষা/কর্মক্ষেত্রের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে রেফারেন্স ধরে আর্টস ও সোশ্যাল সায়েন্স (AOR=1.557) এবং মেডিকেল সায়েন্স (AOR=1.727) তুলনামূলকভাবে বেশি ভুক্তভোগী হওয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে ফলাফলে দেখা গেছে।
মডেল ফিট ও মাল্টিকলিনিয়ারিটি সম্পর্কে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে-Hosmer and Lemshow টেস্ট ০.২৮৬১ (মডেল “reasonably well” ফিট) এবং Mean VIF ১.৬০ (মাল্টিকলিনিয়ারিটি নেই)।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার
গবেষণার আলোচনায় বলা হয়েছে-এটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রেক্ষাপটে ইসলামোফোবিয়া বিষয়ে “প্রথম বড় পরিসরের পরিমাণগত প্রমাণ” দেয়; দৃশ্যমান মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য কেবল পশ্চিমা সমাজে সীমিত নয়।
উপসংহারে গবেষকরা বলেছেন-বাংলাদেশের মতো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে দৃশ্যমানভাবে ধর্মচর্চাকারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, স্নাতক ও তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে ইসলামোফোবিয়া “ব্যাপক এবং সিস্টেমিক”; সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পোশাকভিত্তিক বৈষম্য, মৌখিক হয়রানি ও সাংস্কৃতিক বিদ্রূপ-এবং এগুলো প্রায়ই শিক্ষক/প্রতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঘটে।
সীমাবদ্ধতা (গবেষণার ভাষ্য অনুযায়ী)
গবেষকরা চারটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন-(১) ইসলামি প্রোগ্রাম গ্রুপ থেকে অনলাইন রিক্রুটমেন্ট হওয়ায় সিলেকশন বায়াসের সম্ভাবনা, (২) সেল্ফ-রিপোর্টেড ডেটায় রিকল বায়াস ও ওভার/আন্ডার রিপোর্টিংয়ের ঝুঁকি, (৩) ক্রস-সেকশনাল ডিজাইনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণগত ব্যাখ্যার সীমা, এবং (৪) মূলত দৃশ্যমান ধর্মচর্চাকারীদের ফোকাস করায় কম দৃশ্যমান মুসলিমদের অভিজ্ঞতার পূর্ণ পরিসর ধরা নাও পড়তে পারে।
সূত্র: