{{ news.section.title }}
রমজানে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠের ফজিলত ও গুরুত্ব
রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নবীজির ওপর দুরুদ ও সালাম প্রেরণ করা। এই বরকতময় মাসে প্রত্যেক মুসলিমের উচিত বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা। যেমন-অধিক পরিমাণে নফল সালাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআনে বর্ণিত নিদর্শনসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা এবং তা বুঝার চেষ্টা করা।
পাশাপাশি বেশি বেশি তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠ করা, তাওবা ও ইস্তিগফার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট হওয়া, গরিব-মিসকিন ও অসহায়দের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, প্রতিবেশীদের সম্মান করা এবং অসুস্থদের খোঁজ-খবর নেওয়া-এসব আমলের মাধ্যমেও রমজানের ফজিলত অর্জন করা যায়।
কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে বলেন,
«ينطر الله الى تنافسكم فيه فيباهي بكم ملا ئكته فأروا الله من أنفسكم خيرا فإن الشقي من حرم فيه رحمة الله»
অর্থঃ “আল্লাহ তা‘আলা এ মাসে তোমাদের প্রতিযোগিতার প্রতি লক্ষ্য করেন। তারপর তিনি তার ফিরিশতাদের মধ্যে তোমাদের নিয়ে গর্ব করেন। সুতরাং তোমরা তোমাদের নিজেদের থেকে আল্লাহর জন্য ভালো ও নেক আমলসমূহ তুলে ধর। কারণ, হতভাগা সেই ব্যক্তি যে এ মাসে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়”।
অন্য হাদীসে আরও বলেন,
«مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيهِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ»
“যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো নেক আমল করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করল। আর যে একটি ফরয আদায় করল, সে যেন সত্তরটি ফরয আদায় করল”।
দুরুদ পাঠের ফজিলত :
মহানবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করবেন।”
(মুসলিম, মিশকাত ৯২১)
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর আ’স (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার দরুন তার উপর দশটি রহমত (করুণা) অবতীর্ণ করবেন।
(মুসলিম: ৩৮৪, তিরমিযী: ৩৬১৪, নাসায়ী ৬৭৮, আবূ দাউদ: ৫২৩, আহমাদ: ৬৫৩২)।
অন্য এক বর্ণনায় আছে,
এবং তার ১০টি পাপ মোচন হবে ও সে ১০টি মর্যাদায় উন্নীত হবে।”
(নাসাঈ, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক ১/৫৫০,মিশকাত ৯২২নং)।
মুসলমানদের জীবনে দুরুদ শরিফের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো তাঁর জন্য দুরুদ পাঠ করা।
কোরআনেই আল্লাহ বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাঁর প্রতি দুরুদ ও সালাম পাঠ করো।” (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৬)
এই নির্দেশনার আলোকে সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন এবং আলেমরা অসংখ্য দুরুদ শরিফ বর্ণনা করেছেন। এখানে আমরা কিছু সুপরিচিত দুরুদ তুলে ধরছি-যার মধ্যে কিছু ছোট, আবার কিছু তুলনামূলক দীর্ঘ; তবে প্রতিটিই হৃদয়কে প্রশান্তি দেয় এবং আমলকারীর জন্য বরকতের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে।
১. দুরুদে ইবরাহিম
সর্বাধিক পরিচিত দুরুদ হলো দুরুদে ইবরাহিম
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়াআলা আালি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়াআলা আালি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামিদুম মজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়াআলা আালি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়াআলা আালি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামিদুম মজিদ।”
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি যেমন ইবরাহিম ও তাঁর পরিবারকে রহমত করেছেন, তেমনি মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারকে রহমত করুন। আর যেমন ইবরাহিম ও তাঁর পরিবারকে বরকত দিয়েছেন, তেমনি মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারকে বরকত দিন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসার যোগ্য ও মহান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪০)
২. সংক্ষিপ্ত দুরুদ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়াসাল্লিম।”
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ৩১৪)
৩. দুরুদে সালাম
উচ্চারণ: “আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।”
অর্থ: হে নবী, আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৩১)
৪. দুরুদে উম্মি নবী
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি।”
অর্থ : হে আল্লাহ! উম্মী নবী মুহাম্মদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হাদিস: ১৬৫৪)
৫. দুরুদে বারাকাহ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়াআলা আালি মুহাম্মাদ, ওয়াবারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়াআলা আালি মুহাম্মাদ।”
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারে রহমত করুন এবং বরকত দিন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৬৯৯১)
৬. দুরুদে আবরার
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন আবদিকা ওয়া রাসূলিকা ওয়াসাল্লি আলাল মু’মিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা।”
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন এবং সব মুমিন ও মুসলিমদের ওপর রহমত করুন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৯০৩)
৭. দুরুদে মাসনূন
উচ্চারণ: “সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ।”
অর্থ: আল্লাহ মুহাম্মদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (সুনান নাসায়ী, হাদিস: ১৭৪৬)
৮. দুরুদে কামিল
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন তিব্বিল কুলুবি ওয়া দাওয়াইহা, ওয়া ‘আফিয়াতিল আবদানি ওয়া শিফাইহা, ওয়া নূরিল আবসারি ওয়া জিয়াইহা, ওয়া ‘আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি ওয়া সাল্লিম।”
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের নেতা মুহাম্মদের ওপর রহমত করুন, যিনি অন্তরের আরোগ্য ও রোগের প্রতিকার, শরীরের সুস্থতা, চোখের আলো ও উজ্জ্বলতার উৎস। তাঁর পরিবার ও সাহাবাদের ওপরও রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। (দালাইলুল খাইরাত, প্রকাশনী: দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০১৫, পৃ. ৪৫)
৯. দুরুদে মাকাম মাহমুদ
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আনজিলহুল মাক্বআদাল মুকাররাবা ইন্দাকা ইয়াওমাল কিয়ামাহ।”
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদের ওপর রহমত করুন এবং কিয়ামতের দিনে তাঁকে আপনার নৈকট্যপ্রাপ্ত উচ্চ আসনে বসান। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৬৯৯১; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ১৭২৫৯)
১০. দুরুদে আনওয়ার
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা নূরিল আনওয়ার, সির্রিল আসরার, তিরইয়াকিল আগইয়ার, মিফতাহি বাবিল ইয়াসার, সাইয়্যিদিল আবরার।”
অর্থ: হে আল্লাহ, আলোসমূহের আলো, রহস্যসমূহের রহস্য, বিপদের ওষুধ, সহজতার দরজার চাবি, সৎ ব্যক্তিদের নেতা মুহাম্মদের ওপর রহমত করুন। (দালাইলুল খাইরাত, প্রকাশনী: দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০১৫, পৃ. ৬২)
১১. ছোট দুরুদ
اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ عَلَى نَبَيِّنَا مُحَمَّدٍ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা সল্লি ওয়া সাল্লিম আ’লা নাবিয়্যিনা মুহা’ম্মাদ।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নবী মুহাম্মাদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
ছোট দুরুদ যেমন “সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ”-সহজেই যেকোনো কাজের ফাঁকে পড়া যায়। আর দীর্ঘ দুরুদ যেমন দুরুদে ইবরাহিম, নামাজে এবং বিশেষ ইবাদতের সময়ে পড়া যায়। জুমার দিন শুক্রবার দুরুদ পাঠ বেশি করার নির্দেশও হাদিসে এসেছে (সুনান নাসায়ী, হাদিস: ১৩৭৪)।
ছোট বা বড়-প্রতিটি দুরুদই অমূল্য সম্পদ। দুরুদ ও সালাম কেবল মুখের উচ্চারণ নয়; এটি নবীজির প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও আনুগত্যের প্রকাশ। বেশি বেশি দুরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করি এবং আমাদের গুনাহ মাফের আশা করতে পারি। তাই প্রতিদিন আন্তরিকতার সাথে দুরুদ পাঠ করা উচিত, যাতে আমাদের জীবন সুন্নাহভিত্তিক ও কল্যাণময় হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করার তাওফিক দান করুন এবং এর মাধ্যমে আমাদের অন্তরকে পবিত্র ও আলোকিত করুন। আমীন।