{{ news.section.title }}
সূরা ইখলাসের আমল করলে যে সওয়াব মিলবে
সূরা ইখলাস কুরআনের অন্যতম ফযীলতপূর্ণ সূরা। তওহিদের (আল্লাহর একত্ব) মর্মবাণীকে সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরায় এ সুরাকে “কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ”–এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলে সহিহ হাদিসে এসেছে। মুসলিমদের দৈনন্দিন আমলে-নামাজে, দোয়ায়, সকাল–সন্ধ্যার যিকিরে এবং ঘুমের আগে-এই সূরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষ করে সূরা ইখলাস তিনবার এবং দশবার পাঠের ফযীলত সম্পর্কিত বক্তব্য বহু মানুষ জানতে চান। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে-সূরা ইখলাস একবার পড়লে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। এ হিসেবে তিনবার পড়লে কুরআন খতমের সওয়াবের সঙ্গে তুলনা করে বোঝানো হয় যে, সওয়াবের দিক থেকে এটি অত্যন্ত বড় আমল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
‘সূরা ইখলাস একবার পড়লে এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পাঠের সমান ছওয়াব পাওয়া যায়’ (সহীহ মুসলিম, হা/৮১১; সহীহ বুখারী, হা/৫০১৩; মিশকাত, হা/২১২৭)।
আর দশবার পাঠের ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত আছে-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দশবার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করবেন’ (আহমাদ, সিলসিলা ছহীহা, হা/৫৮৯; ছহীহুল জামে‘, হা/৬৪৭২)।
এছাড়াও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
‘যে ব্যক্তি সূরা ইখলাসকে পছন্দ করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে’ (তিরমিযী, হা/১৯০১; মিশকাত, হা/২১৩০)।
সূরা ইখলাস পরিচিতি: সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তওহিদের মূলভিত্তি
সূরা ইখলাস কুরআনের ১১২তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৪টি, রুকু ১টি। এটি মক্কী না মাদানী-এ নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, মুশরিকরা বা আহলে কিতাব নবীজি (সা.)–কে প্রশ্ন করেছিল-আল্লাহর পরিচয় কী, তাঁর ‘বংশ-পরিচয়’ কী? তাদের প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ এই সূরা নাজিল করেন-যাতে আল্লাহর একত্ব, অমুখাপেক্ষিতা, জন্ম দেওয়া–নেওয়ার বিষয় থেকে পবিত্রতা এবং তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই-এসব আকিদার মূলনীতি ঘোষণা করা হয়।
কুরআনের “এক-তৃতীয়াংশ” কেন বলা হয়?
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে-এক ব্যক্তি অন্য একজনকে রাতে বারবার সূরা ইখলাস পড়তে শুনেছেন। সকালে বিষয়টি রাসূল (সা.)-কে জানানো হলে তিনি বলেন-
‘ওই সত্তার শপথ! যার কুদরতের হাতে আমার জীবন, অবশ্যই এ সূরা কোরআন মাজিদের এক-তৃতীয়াংশের সমান।’ (সহিহ বুখারি : ৫০১৩; আবু দাউদ : ১৪৬১; নাসায়ি : ২/১৭১; মুআত্তা মালেক : ১/২০৮)
উলামায়ে কেরাম ব্যাখ্যা করেছেন-কুরআনের মৌলিক তিনটি বড় বিষয় (তওহিদ, রিসালাত, আখিরাত)–এর মধ্যে তওহিদ অংশের শিক্ষা সূরা ইখলাসের মধ্যে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণভাবে এসেছে। তাই সওয়াব ও অর্থবহতার দিক থেকে এই সুরাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
সূরা ইখলাস (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
(পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি)
১. قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
উচ্চারণ: কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।
অর্থ: বলুন, তিনিই আল্লাহ, একক/অদ্বিতীয়
২. اللَّهُ الصَّمَدُ
উচ্চারণ: আল্লাহুস সামাদ।
অর্থ: আল্লাহ অমুখাপেক্ষী (সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারো নন)
৩. لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
উচ্চারণ: লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ।
অর্থ: তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি
৪. وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণ: ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
অর্থ: এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের ঘটনা: সূরা ইখলাসের প্রেমিক সাহাবি
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আছে। রাসূল (সা.) একদল সাহাবিকে সফরে পাঠান এবং একজনকে আমির/নেতা করেন। তিনি নামাজে ইমামতি করার সময় প্রতি রাকাতে ফাতিহার পর বারবার সূরা ইখলাস পড়তেন। সাহাবিরা ফিরে বিষয়টি জানালে রাসূল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করতে বলেন-কেন সে এমন করে?
তিনি জানান-এই সুরায় আল্লাহর গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে, তাই আমি একে ভালোবাসি।
তখন নবী (সা.) বলেন-‘তোমরা তাকে গিয়ে বলো, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৭৫; মুসলিম, হাদিস : ৮১৩; নাসায়ি, হাদিস : ২/১৭০)
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়-সূরা ইখলাস শুধু মুখে পড়ার বিষয় নয়; আল্লাহর পরিচয় বুঝে, ভালোবেসে তিলাওয়াত করা ঈমানের গভীরতার আলামত।
সূরা ইখলাস ভালোবাসা-জান্নাতে যাওয়ার সুসংবাদ
এক সাহাবি রাসূল (সা.)-কে বললেন, “আমি সূরা ইখলাসকে ভালোবাসি।”
রাসূল (সা.) বলেন-‘এই ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৯০১ / বর্ণনার সূত্রভেদে রেওয়ায়েত এসেছে)
এখানে শিক্ষাটি খুব পরিষ্কার: আল্লাহর তওহিদের বাণীকে যে ভালোবাসে, সে ঈমানের মূলকে আঁকড়ে ধরে।
দৈনন্দিন আমলে সূরা ইখলাস: সকাল–সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে
হাদিসে এসেছে, বিপদ–আপদ ও ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য সকাল–সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া অত্যন্ত উপকারী।
আর ঘুমের আগে রাসূল (সা.)–এর সুন্নত ছিল-দুই হাতের তালু একত্র করে সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে ফুঁ দিয়ে শরীরে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নেওয়া-এভাবে তিনবার করা। (বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিজি–সূত্রে বর্ণনা)
এটি এমন একটি আমল, যা খুব অল্প সময়ে করা যায়, কিন্তু নিয়মিত করলে ঈমানি সুরক্ষা ও আত্মিক প্রশান্তি বাড়ে।
সূরা ইখলাস তওহিদের ভিত্তি: দ্বীনের মূল কথা এক সূরায়
ইসলামের সবচেয়ে কেন্দ্রীয় বিষয় হলো তওহিদ-আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী, তিনি জন্ম দেন না-জন্ম নেন না, তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। এই চার আয়াতেই আকিদার বড় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই যিনি সূরা ইখলাসের অর্থ বুঝে পড়েন, তিনি দ্বীনের পথে চলার “মূল বুনিয়াদ” ধরতে পারেন-এটাই এই সূরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।