সূরা ফালাক: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং ফজিলত

সূরা ফালাক: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং ফজিলত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

মানুষের জীবনে ভয়, অনিশ্চয়তা, হিংসা, অজানা বিপদ-এসব কখনো চোখে দেখা যায়, কখনো যায় না। ইসলাম এমন সময় বান্দাকে শিখিয়েছে-দুশ্চিন্তা বা ভয়কে শক্তিতে বদলে দিতে, আর তা সম্ভব হয় আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার মাধ্যমে। এই আশ্রয় প্রার্থনার সবচেয়ে শক্তিশালী ও পরিচিত সূরাগুলোর একটি হলো সূরা ফালাক।

সূরা ফালাক পবিত্র কোরআনের ১১৩তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৫। সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। শয়তানের কুমন্ত্রণা, জাদুটোনা, হিংসা এবং অদৃশ্য/অদেখা অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে-এ সূরার নিয়মিত আমলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। সূরাটিতে মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে শেখান, কীভাবে তিনি একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং কোন কোন অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা চাইবে। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় সূরাটির বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতার কথাও এসেছে। নিচে অর্থসহ সুরাটির উচ্চারণ তুলে ধরা হলো-

সুরা আল - ফালাক


بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

পরম করুণাময় অসিম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

قُلْ أَعُوذُ بِرَ‌بِّ الْفَلَقِ

কুল্ আ‘ঊযু বিরব্বিল্ ফালাক্বি

বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার,

مِن شَرِّ‌ مَا خَلَقَ

মিন্ শার রিমা-খলাক্ব

তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে,

وَمِن شَرِّ‌ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ

অমিন্ শাররি গ-সিক্বিন্ ইযা-অক্বাব্

অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়,

وَمِن شَرِّ‌ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ

অমিন্ শাররি ন্নাফ্ফা-ছা-তি ফিল্ ‘উক্বদ্

গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে

وَمِن شَرِّ‌ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

অমিন্ শাররি হা-সিদিন্ ইযা-হাসাদ্

এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে ।

সূরা ফালাকের ফজিলত: সুন্নত আমল ও নিরাপত্তার দোয়া

সাধারণত যেকোনো বিপদ–আপদ, অজানা ক্ষতি ও অশুভতার আশঙ্কা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য সূরা ফালাক এবং তার পরের সূরা নাসের আমল সুন্নত। মহানবী (সা.) নিজেও বিপদ–আপদে, অসুস্থতায় এবং ক্ষতি থেকে সুরক্ষার জন্য এই সূরাগুলো পড়তেন-এ কথা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে।

এক বর্ণনায় এসেছে, তাঁকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে জাদু করা হয়েছিল এবং একটি রশিতে ১১টি গেরো দেওয়া হয়েছিল। এরপর এই দুই সূরা (ফালাক ও নাস)-এর ১১টি আয়াত পড়ে সেই ১১টি গেরো খুলে যায়-অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্যে ক্ষতি দূর হয়। এই ঘটনা মুসলিমদের জন্য একটি বড় শিক্ষা-অদৃশ্য অনিষ্ট, হিংসা কিংবা কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আল্লাহর আশ্রয়ের কোনো বিকল্প নেই।

সূরা ফালাকের সারকথা: “আশ্রয়”–ভিত্তিক জীবনদর্শন

এই সূরার মূল বক্তব্য হলো-মানুষের অসহায়তা স্বীকার করে একমাত্র আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। এখানে প্রথম আয়াতে আশ্রয়দাতা সত্তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে-তিনি ‘রব্বিল ফালাক’; অর্থাৎ প্রভাত/ভোরের পালনকর্তা, যিনি অন্ধকার কেটে আলো আনেন। এরপর পর্যায়ক্রমে বলা হয়েছে-কোন কোন অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে হবে।

সূরাটির ২ নম্বর আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে সৃষ্টির ক্ষতি থেকে। কারণ মানুষ নিজেও ভুল করতে পারে, আবার অন্য সৃষ্টির পক্ষ থেকেও ক্ষতি আসতে পারে-দুই দিক থেকেই আল্লাহর নিরাপত্তা দরকার।

৩ নম্বর আয়াতে এসেছে রাত্রির অন্ধকারের অনিষ্ট। এখানে রাত শুধু সময় নয়-অশুভ, অজানা ঝুঁকি, অপরাধ, ভীতি-এসবের ইঙ্গিতও বহন করে। অন্ধকারে অনেক ক্ষতি অগোচর থাকে; তাই অদেখা বিপদ থেকে বাঁচার আবেদন করা হয়েছে।

৪ নম্বর আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে গ্রন্থিতে ফুঁ দিয়ে জাদু করার অনিষ্ট থেকে-অর্থাৎ যাদুটোনা/কালো জাদুর ক্ষতি।

৫ নম্বর আয়াতে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে-বিশেষ করে “যখন সে হিংসা করে”। অর্থাৎ হিংসা কেবল মনে থাকলেই নয়, যখন তা কাজের মাধ্যমে ক্ষতির রূপ নেয়-তখন তা ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে সূরা ফালাক যেন শেখায়-অন্ধকার ভেদ করে আলো যিনি বের করেন, তিনিই বান্দাকে সব অনিষ্ট থেকেও নিরাপদ রাখতে পারেন। তাই আল্লাহর আশ্রয়ই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

চারটি অনিষ্ট থেকে আশ্রয়ের নির্দেশ

এই সূরায় আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)–কে চার ধরনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে বলেন:

  • সৃষ্টির অমঙ্গল থেকে
  • ঘন অন্ধকার রাত্রির অমঙ্গল থেকে
  • গেরোয় ফুঁ দিয়ে যাদু করা লোকদের অমঙ্গল থেকে
  • এবং হিংসুকের অমঙ্গল থেকে যখন সে হিংসা করে

এখানে একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা আছে-হিংসা শুধু ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি সমাজে সম্পর্ক নষ্ট করে, নিরাপত্তা ও শান্তি কমায়। তাই মুমিনকে হিংসা থেকে বাঁচতে এবং হিংসা–সৃষ্ট ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে।

সূরা ফালাকের আমল: কখন কীভাবে পড়বেন

সূরা ফালাক পড়ার কিছু পরিচিত সুন্নত আমল রয়েছে, যা নিয়মিত করলে অনেকেই মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক নিরাপত্তা অনুভব করেন।

১) প্রতি ফরজ নামাজের পর
হজরত উকবা বিন আমির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’

২) রাতের আমল ও দৈনিক সুরক্ষা
হজরত উকবা বিন আমির (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন-উকবা, আমি কি তোমাকে এমন কয়েকটি সুরা শেখাব, যেগুলোর মতো তাওরাত, জবুর, ইঞ্জিল-even কোরআনেও আর নাজিল হয়নি? প্রতি রাতেই তুমি এসব সুরা অবশ্যই পড়বে-সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস।

এই বর্ণনাগুলো মুসলিম জীবনে “তিন কুল”-এর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।


সম্পর্কিত নিউজ