রমজানে রোযা ও ইফতারের দোয়া : ইসলামি নির্দেশনা ও ফজিলত

রমজানে রোযা ও ইফতারের দোয়া : ইসলামি নির্দেশনা ও ফজিলত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

রোযা বা রোজা, সাউম বা সাওম হলো ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের তৃতীয়। সাওমের অর্থ হলো বিরত থাকা, আত্মসংযম এবং আত্মপরিশুদ্ধি।রোজা হলো সুবহে সাদিক বা ভোরের সূক্ষ্ম আলো থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, পাপাচার, কামাচার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকা, পাশাপাশি যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও সংযম অবলম্বন করা।

ইসলামী বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতিটি দিন রোজা রাখা ফরজ, যার অর্থ এটি বাধ্যতামূলক এবং অবশ্যই পালনীয়।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 
যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিন রোযা রাখে, আল্লাহ্ তার বিনিময়ে জা'হান্নাম থেকে তার মুখমণ্ডল কে সত্তর বছরের দূরত্বে রাখেন।
- সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭১৮

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
শয়তান ও দুষ্ট জ্বিনদেরকে রমযান মাসের প্রথম রাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না, খুলে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেনঃ হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। (জামে' আত-তিরমিজি ৬৮২, ইবনু মাজাহ ১৬৪২)
ইফতারের দোয়া

সারা দিন রোজা রাখার পর যে পানাহারের মাধ্যমে রোজার সমাপ্তি করা হয় সেটাকে ইফতার বলে। ইফতারের মুহূর্ত রোজাদারের জন্য পরম আনন্দের। ইফতারের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। আল্লাহর নবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম ইফতার করতেন।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ। একটি আনন্দ হচ্ছে যখন সে ইফতার করে। আরেকটি হচ্ছে যখন সে প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭৬৬)


ইফতারের করার সময় যে দোয়া পড়বেন

আরবি :

بسم الله اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ

ইফতারের দোয়া বাংলা উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা আফতারতু।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করেছি। (মুআজ ইবনে জাহরা থেকে বর্ণিত, আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৮)

ইফতারের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা হলো- ইফতারে বিলম্ব করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যত দিন পর্যন্ত সময় হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন কল্যাণের সঙ্গে থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৫২)

ইফতারের পরের দোয়া

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন, তখন বলতেন-

ذَهَبَ الظَّمَاءُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الْأَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ

বাংলা উচ্চারণ : জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতাল্লাতিল উ’রুকু; ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।

অর্থ : ‘(ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো।’ (আবু দাউদ, হাদিস, ২৩৫৭)

রোজাদার মুসলিমরা ইফতারের জন্য নানারকম সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে মহান আল্লাহপাকের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন। হুকুম পেলেই তারা খাবার গ্রহণ করেন। এই নিয়ম ইফতারের অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে ইসলামে পরিচিত।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় তারাই, যারা আগেভাগে ইফতার করে। (তিরমিজি শরিফ)

ইফতারের সময় সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সুবহে সাদিক থেকে রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আগে ইফতার করতেন কয়েকটি তাজা খেজুর দিয়ে। যদি তাজা খেজুর না পান, তাহলে শুকনো খেজুর (খুরমা) দিয়ে ইফতার করতেন। আর যদি তা ও পাওয়া না যেত, তবে কয়েক ঢোঁক পানি পান করেই ইফতার সম্পন্ন হতো। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

রোজাদারকে ইফতার করানোর ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তিকে সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে সামান্য দুধ, খেজুর বা পানির শরবত দিয়ে ইফতার করাবে।

এছাড়া, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে সম্পূর্ণভাবে আহার করাবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিনে তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাউসে কাওসারের পানি পান করিয়ে পরিতৃপ্ত করবেন। সেই পানি পান করার পর সে জান্নাতে প্রবেশের আগে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবেন না। (মিশকাত শরিফ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ধরনের ব্যক্তির দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না:

  • ইফতারেরসময় রোজাদারের দোয়া
  • ন্যায়বিচারকশাসকের দোয়া
  • এবংযিনি অবিচারের শিকার হয়েছেন (মজলুমের দোয়া)

হজরত যায়েদ ইবনে জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্যও রোজাদারের মতো সমপরিমাণ সওয়াব হবে। তবে এতে রোজাদারের সওয়াব বা নেকি কোনোভাবেই কমানো হবে না। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, নাসাঈ)

ইফতারের জন্য কাউকে দাওয়াত করার বিষয়েও হাদিস আছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, এক মহিলা তাকে ইফতারের জন্য দাওয়াত করলেন। তিনি এতে সাড়া দিয়ে বলেন, “যে গৃহবাসী কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তাদের জন্যও সমপরিমাণ সওয়াব হবে।”

মহিলা তখন বলেন, তিনি চাইছেন, আমি কিছুক্ষণ এখানে অবস্থান করি যাতে এই নেকি তার পরিবারের মধ্যেও বিতরণ হয়। (মুসান্নেফে ইবনে আবদুর রাজ্জাক)

অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো গরিব রোজাদারকে ইফতারের জন্য আর্থিক সাহায্য বা সহযোগিতা দেয়, তাহলে সে ব্যক্তিই ইফতারের সওয়াব পাবে। এছাড়া, এতে গরিবও উপকৃত হবে এবং তার আর্থিক অবস্থাও কিছুটা স্থিতিশীল হবে। এটি ইফতারের নেকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

ইফতারের সময় করণীয় 

ইফতারের সময় করণীয় বিষয়ে ইসলামে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আছে, যা অনুসরণ করলে রোজাদারের ইবাদত ও সাওয়াব আরও পূর্ণ হবে। এগুলো নিম্নরূপ:

সময়সীমার প্রতি মনোযোগ: ইফতারের সময় যখন পৌঁছায়, তখন তা অবিলম্বে শুরু করা উচিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) ইফতারের সময় হঠাৎ দেরি করার অনুমতি দেননি।

মনোযোগী হওয়া: ইফতারের সময় অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত না থেকে বরকতময় খাবারে মনোযোগী হওয়া উচিত। কারণ রোজাদারের জন্য সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো এই সময়।

দোয়া ও ইস্তেগফার: ইফতারের সময় প্রচুর দোয়া ও ইস্তেগফার পড়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা এই সময়ে দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন।

খেজুর বা হালকা খাবার দিয়ে ইফতার: ইফতারের শুরুতে খেজুর বা হালকা খাবার দিয়ে ইফতার করার চেষ্টা করা উচিত, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।

ভারী খাবার পরিহার: ইফতারের সময় একসাথে ভারী খাবার না খেয়ে, আগে মাগরিব নামাজ আদায় করা এবং তারপর খাবার গ্রহণ করা উত্তম। এতে শরীর সুস্থ ও সবল থাকে।

নামাজের প্রস্তুতি: ইফতার শেষ করে দ্রুত নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত, যাতে ইবাদত ও দোয়া অব্যাহত থাকে।


সম্পর্কিত নিউজ