সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও তাসবিহ

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও তাসবিহ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

সালাতুত তাসবীহ (আরবি: صلاة تسبيح) হলো এক ধরনের নফল নামাজ, যা তাসবীহের নামাজ নামেও পরিচিত। এখানে সালাত শব্দের অর্থ “নামাজ” এবং তাসবীহ বলতে বোঝানো হয় ‘সুবহানাল্লাহি, ওয়াল হামদুলিল্লাহি, ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার’ এই ধরণের ধ্যান ও প্রার্থনার শব্দসমূহ।

এই নামাজে বিশেষভাবে এসব তাসবীহ পাঠ করা হয়। এটি ইসলামে ঐচ্ছিক ইবাদত, অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মতো বাধ্যতামূলক নয়।

নবী মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, জীবনে অন্তত একবার এই নামাজ পাঠ করা উচিত। নফল নামাজগুলোর মধ্যে সালাতুত তাসবীহ বিশেষ ফজিলতপূর্ণ, গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির জন্য পরিচিত।

ইসলাম ধর্মের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অনুসারীদেরকে এ নামাজ পালনে উৎসাহিত করছেন। জীবনে একবার হলেও মুসলমানরা যেনো এ নামাজ পড়ে এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন।

রাসুল (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস-কে বলেন:

“চাচা, যদি সম্ভব হয়, দিনে একবার সালাতুত তাসবীহ নামাজ পাঠ করুন। পারলে না, তাহলে সপ্তাহে একবার; সেটাও না পারলে মাসে একবার; সেটাও না পারলে বছরে একবার। সবশেষে, তাও যদি সম্ভব না হয়, অন্তত জীবনে একবার হলেও পাঠ করুন।”

সালাতুত তাসবিহ নামাজ ৪ রাকাত বিশিষ্ট প্রত্যেক ওই সালাত, যেখানে প্রতিরাকাতে অতিরিক্ত ৭৫ বার করে ৪ রাকাতে সর্বমোট ৩০০ বার (سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ) (সুবহানাল্লাহি, ওয়াল হামদুলিল্লাহি, ওয়া-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার) এই তাসবিহটির সাথে আদায় করা হয়ে থাকে।

এই নামাজ আদায়ের ২টি পদ্ধতি হাদিস থেকে প্রমাণিত।

১/ দাঁড়িয়ে ৪৫ ও বসে ৩০ বার তাসবিহটি পাঠ করা, প্রতিরাকাতে ৪৫+৩০=৭৫ এবং চার রাকাতের সর্বমোট ৭৫×৪=৩০০ তাসবিহ।

২/ দাঁড়িয়ে ৩৫ ও বসে ৪০ বার তাসবিহটি পাঠ করা, প্রতিরাকাতে ৩৫+৪০=৭৫ এবং চার রাকাতের সর্বমোট ৭৫×৪=৩০০ তাসবিহ।


সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ত

আরবিঃ-

نَوَايْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّّهِ تَعَالَى ارْبَعَ رَكَعَاتِ صَلَوةِ التَّسْبِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللَّهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَر

বাংলা উচ্চারণঃ-

নাওয়াতু আন ওসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা আরবায়া রাকাতি সালাতিত তাসবিহি সুন্নাতু রসুলিল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা,বাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবর।

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ত বাংলাঃ-

আমি ক্যাবলামুখী হয়ে চার রাকাত সালাতুল তাসবিহ নামাজ আল্লাহর জন্য আদায় করছি “আল্লাহু আকবার”

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম ও গুরুত্ব

সালাতুত তাসবিহ একটি বিশেষ ৪ রাকাত সুন্নত নামাজ। এই নামাজে একটি বিশেষ তাসবিহ বারবার পড়তে হয়। পুরো নামাজে মোট ৩০০ বার এই তাসবিহ পাঠ করা হয়।

তাসবিহটি হলো

(سبحان الله، والحمدُ لله، ولا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَالله أكبر)

উচ্চারণ:
সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার।

কখন পড়া যায়

এই নামাজ যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে বিশেষ করে - 

  • জুম্মার রাত (শুক্রবার রাত)
  • রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ রাতগুলো

এই সময়গুলোতে পড়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)।

সামনে পবিত্র রমজান মাস আসছে। তাই এই মাসে সম্ভব হলে কেউ যেন সালাতুত তাসবিহ নামাজ মিস না করেন।

সালাতুত তাসবিহ নামাজের মূল কাঠামো

এই নামাজ ৪ রাকাত এবং প্রতিটি রাকাতে ৭৫ বার করে তাসবিহ পড়তে হয়।

অর্থাৎ,

৭৫ × ৪ = মোট ৩০০ বার তাসবিহ

এই তাসবিহ সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পাঠের পর, রুকু, সিজদা ও বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়তে হয়।

নামাজের নিয়ম
নিয়ত

৪ রাকাত সালাতুত তাসবিহের নিয়ত করুন।

প্রথম রাকাত

১. আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করুন।

২. প্রথমে ছানা পড়ুন।

৩. এরপর সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়ুন।

৪. তারপর ১৫ বার তাসবিহ পড়ুন

সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার (১৫ বার)

রুকুতে

রুকুর তাসবিহ (সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম) পড়ার পর

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

রুকু থেকে উঠার পর

সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বলার পর

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

প্রথম সিজদা

সিজদার তাসবিহ (সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা) পড়ার পর

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

দুই সিজদার মাঝে বসে

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

দ্বিতীয় সিজদা

দ্বিতীয় সিজদায় গিয়ে সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা পড়ার পর

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

দ্বিতীয় সিজদার পর বসে

১০ বার তাসবিহ পড়ুন।

এভাবে এক রাকাতে মোট ৭৫ বার তাসবিহ পড়া সম্পন্ন হবে।

দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত

একই নিয়মে প্রতিটি রাকাতে ৭৫ বার করে তাসবিহ পড়তে হবে।

মোট তাসবিহ

৪ রাকাতে মোট তাসবিহ পড়া হবে-

৭৫ × ৪ = ৩০০ বার

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা তাসবিহ গণনা

তাসবিহ জোরে জোরে বা প্রকাশ্যে আঙুল গুনে পড়া ঠিক নয়।
মনে মনে অথবা আঙুল চেপে চুপচাপ গণনা করা যেতে পারে।

ভুলে গেলে

যদি কোনো ধাপে তাসবিহ পড়া বাদ পড়ে যায়-

পরের ধাপে সেই সংখ্যা যোগ করে পড়তে পারেন
অথবা

পরের রাকাতের শুরুতে তা পূরণ করে নিতে পারেন।

সালাতুত তাসবীহ নামাজ সংক্রান্ত তথ্য

১. সালাতুত তাসবীহ সুন্নত না নফল?
সালাতুত তাসবীহ একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ। নবী মুহাম্মদ তাঁর চাচা হযরত আব্বাস-কে বলেছেন: সম্ভব হলে প্রতিদিন একবার, না পারলে সপ্তাহে, মাসে বা বছরে অন্তত একবার। তাও সম্ভব না হলে জীবনে অন্তত একবার পড়া উচিত।

২. কখন পড়তে হয়?
সালাতুত তাসবীহের জন্য নির্দিষ্ট সময় নেই; যেকোনো সময়ে এটি আদায় করা যায়।

৩. জামাতে পড়া যাবে কি?
জি, সালাতুত তাসবীহসহ যেকোনো নফল নামাজ চাইলে জামাতে আদায় করা যায়।

সালাতুত তাসবীহে তাসবীহ ভুল হলে করণীয়

১. হাত দিয়ে তাসবীহ গণনা:
‘সালাতুত তাসবীহ’ নামাজে দানাদার তাসবীহ হাতে ধরে গণনা করা মাকরূহ বা অনুচিত। আঙ্গুলের করগুলোতেও গণনা করা উচিত নয়। বরং, হাতের আঙুলের মাথা টিপে টিপে তাসবীহ গণনা করতে হবে।

২. ভুল তাসবীহের আদায়:

যদি কোনো স্থানে তাসবীহ পড়তে ভুল হয়ে যায়, তা পরবর্তী তাসবীহে আদায় করতে হবে।

তবে ক্বওমা (দাঁড়ানো অবস্থায়), রুকু থেকে দাঁড়ানো, এবং দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে ভুল তাসবীহ আদায় করা যাবে না।

৩. সূরা-ক্বিরায়াতের আগে বা পরে ভুল:

সূরা-ক্বিরায়াত পড়ার আগে তাসবীহ ভুলে গেলে, সূরা-পাঠ শেষে তা আদায় করতে হবে।

ক্বিরায়াতের পরে ভুল হলে রুকুতে গিয়ে আদায় করতে হবে।

রুকু ও সিজদায় ভুল তাসবীহ:

রুকুতে তাসবীহ ভুল হলে প্রথম সিজদায় তা আদায় করতে হবে।

প্রথম সিজদায় তাসবীহ ভুলে গেলে দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে নয়, বরং দ্বিতীয় সিজদায় তা আদায় করতে হবে।

দ্বিতীয় সিজদায় তাসবীহ ভুল হলে পরের রাকায়াতে সূরা-ক্বিরায়াতের আগে আদায় করতে হবে।

শেষ সিজদায় ভুল:

নামাজের সর্বশেষ সিজদায় তাসবীহ পড়তে ভুল হলে, সালাম দেওয়ার পূর্বে তা পড়ে নিতে হবে।

সালাতুত তসবিহ নামাজের ফজিলত
রাসুল (সা.) বলেছেন, এই নামাজে গুনাহ মাফ হয়, এমনকি গুনাহ সমুদ্রের ফেনার মতো বেশি হলেও। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১,২৯৭)।

এই নামাজ যেকোনো সময় পড়া যায়, তবে অন্য নামাজ পড়ার নিষিদ্ধ সময়গুলোতে, অর্থাৎ সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ঠিক দুপুরের সময়ে পড়া যাবে না। বিশেষত রাতের বেলা বা তাহাজ্জুদ নামাজের সময় পড়া উত্তম।


সম্পর্কিত নিউজ