{{ news.section.title }}
চাশতের নামাজের ফজিলত,পড়ার নিয়ম ও নিয়ত
ইসলামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য ফরজ। তবে ফরজ নামাজের পাশাপাশি আরও কিছু নফল ও সুন্নত নামাজ রয়েছে, যেগুলো আদায় করলে অতিরিক্ত সওয়াব লাভ করা যায়। এসব নামাজের মধ্যে অন্যতম একটি হলো চাশতের নামাজ, যাকে আরবি ভাষায় সালাতুদ দুহা বলা হয়।
এ নামাজ মূলত একটি নফল ইবাদত। নিয়মিত আদায় করলে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা যায় এবং অনেক সওয়াব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ইসলামের বিভিন্ন হাদিসে চাশতের নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়।
চাশতের নামাজের সময়
চাশতের নামাজের সময় শুরু হয় সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর থেকে। সাধারণত সূর্য ওঠার প্রায় ১৫ মিনিট পর থেকে এ নামাজ আদায় করা যায় এবং সময় থাকে দ্বিপ্রহরের কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত।
ইশরাকের নামাজ আদায় করার পরও চাশতের নামাজ পড়া যায়। অর্থাৎ সূর্য একটু ওপরে ওঠার পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত সময়টুকু চাশতের নামাজের জন্য উপযুক্ত সময়।
হাদিসে চাশতের নামাজের উত্তম সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে-
صلاة الأوابين حين ترمض الفصال
‘চাশতের নামাজ পড়া হবে যখন সূর্যের তাপ প্রখর হয়।’ (মুসলিম: ৭৪৮)
অর্থাৎ সূর্য যখন বেশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং দিনের আলো স্পষ্টভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এ নামাজ আদায় করা উত্তম।
চাশতের নামাজ কত রাকাত
চাশতের নামাজ মূলত নফল নামাজ। তাই এর রাকাত সংখ্যা কিছুটা ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। সাধারণভাবে এই নামাজ ২ রাকাত থেকে শুরু করে ৪, ৮ বা ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়।
তবে অধিকাংশ আলেমের মতে ৪ রাকাত পড়া উত্তম। অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) ৮ রাকাত পর্যন্তও চাশতের নামাজ আদায় করেছেন।
হাদিসে এসেছে, মক্কা বিজয়ের দিন দুপুরের আগে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আলী (রা.)-এর বোন উম্মে হানি (রা.)-এর ঘরে সংক্ষিপ্তভাবে ৮ রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করেছিলেন। যদিও নামাজটি সংক্ষিপ্ত ছিল, তবুও তিনি রুকু ও সেজদায় পূর্ণ ধীরস্থিরতা বজায় রেখেছিলেন এবং প্রতি দুই রাকাত শেষে সালাম ফিরিয়েছিলেন। (বুখারি: ২০৭)
চাশতের নামাজের নিয়ম
চাশতের নামাজ আদায়ের নিয়ম মূলত সাধারণ নফল নামাজের মতোই। অর্থাৎ-
দুই রাকাত করে নামাজ পড়তে হবে
সূরা ফাতিহা পাঠের পর অন্য কোনো সূরা মিলাতে হবে
রুকু, সিজদা ও অন্যান্য রুকন স্বাভাবিক নিয়মেই আদায় করতে হবে
হাদিসে নফল নামাজ সম্পর্কে বলা হয়েছে-
صلاة الليل والنهار مثنى مثنى
‘দিন ও রাতের নফল নামাজ দুই দুই রাকাত করে।’ (তিরমিজি: ৫৯৭; আবু দাউদ: ১২৯৫)
এ কারণে চাশতের নামাজও সাধারণত দুই রাকাত করে আদায় করা হয়।
চাশতের নামাজের নিয়ত
চাশতের নামাজের জন্য আলাদা কোনো দীর্ঘ নিয়ত বাধ্যতামূলক নয়। সহজভাবে মনে মনে নিয়ত করা যায়-
আমি দুই রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করছি।
প্রতিটি দুই রাকাত শেষে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরিফ ও দোয়া পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।
চাশতের নামাজের ফজিলত
চাশতের নামাজের অনেক ফজিলত রয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে এ নামাজের মর্যাদা ও গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-
আমার প্রিয়তম নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন, যেন আমি তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ত্যাগ না করি। প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, চাশতের নামাজ পড়া ও ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করা। (বুখারি: ১১৭৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) চাশতের নামাজকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং সাহাবিদেরও তা আদায় করার উপদেশ দিতেন।
আরেকটি হাদিসে চাশতের নামাজের বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
‘মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড়া আছে। অতএব, মানুষের কর্তব্য হলো প্রত্যেক জোড়ার জন্য একটি করে সদকা করা। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, “হে আল্লাহর রসুল! কার শক্তি আছে এই কাজ করার?” তিনি বলেন, “মসজিদে কোথাও থুতু দেখলে তা ঢেকে দাও অথবা রাস্তায় কোনো ক্ষতিকারক কিছু দেখলে সরিয়ে দাও। তবে এমন কিছু না পেলে, চাশতের দুই রাকাত নামাজ এর জন্য যথেষ্ট।”’ (আবু দাউদ: ৫২২২)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, চাশতের দুই রাকাত নামাজ ৩৬০টি সদকার সমতুল্য সওয়াব এনে দিতে পারে।
আরেক বর্ণনায়ও বলা হয়েছে, মানুষের শরীরে ৩৬০টি জোড়া রয়েছে এবং প্রতিটি জোড়ার জন্য একটি করে সদকা করা প্রয়োজন। যদি কেউ তা করতে না পারে, তাহলে চাশতের দুই রাকাত নামাজ সেই সদকার সমতুল্য হয়ে যায়। (আবু দাউদ; মিশকাত)
চাশতের নামাজের গুরুত্ব
চাশতের নামাজ মুমিনদের জন্য এক বিশেষ নিয়ামতস্বরূপ। এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তাই না পড়লে গুনাহ হবে না। কিন্তু নিয়মিত আদায় করলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিপুল সওয়াব লাভ করা যায়।
অনেক আলেম বলেন, এই নামাজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর স্মরণকে আরও দৃঢ় করে এবং বান্দাকে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে।
চাশতের নামাজ: আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম
চাশতের নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত, যা সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত আদায় করা যায়। দুই রাকাত থেকে শুরু করে একাধিক রাকাত পড়া সম্ভব হলেও চার রাকাত পড়া উত্তম বলে মনে করা হয়।
হাদিসে এর অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তাই সুযোগ থাকলে নিয়মিত এই নামাজ আদায় করা একজন মুমিনের জন্য উত্তম এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি সুন্দর মাধ্যম।